বুধবার, ২০ জানুয়ারী ২০২১, ০৪:১১ পূর্বাহ্ন

ইউরোপে মানবপাচারের নতুন রুট বলকান

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই, ২০২০
  • ৪৯ বার

মানবপাচারকারী চক্রের গুলিতে ২৬ বাংলাদেশিসহ ৩০ জন নিহত ও সাম্প্রতিক সময়ে ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবিতে বহু মানুষ হতাহতের পর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোয় অভিবাসীদের ইউরোপে মানবপাচারের বিষয়টি আবারও নাড়া দেয়। এ ছাড়া ইতালি ও গ্রিসের কোস্টগার্ডের তৎপরতায় লিবিয়া থেকে সাগরপথে ইতালি বা গ্রিসে প্রবেশ কঠিন হয়ে পড়ায় বলকান রুট ব্যবহার করছে মানবপাচারকারীরা। ইউরোপের অন্য অংশের তুলনায় বলকান অঞ্চলের দেশগুলো অর্থনৈতিক দিক থেকে অনেকটাই দুর্বল। অপরাধপ্রবণতাও অনেক বেশি। এ সুযোগে বলকান দেশগুলোকে ঘিরে বর্তমানে ইউরোপে মানবপাচার চক্রের এক বিশাল নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে।

ইউরোপে মানবপাচারে এতদিন বাংলাদেশ-তুরস্কের ইস্তাম্বুল-লিবিয়া, বাংলাদেশ-ভারত-শ্রীলংকা (৪-৫ দিন অবস্থান)-ইস্তাম্বুল (ট্রানজিট)-লিবিয়া এবং বাংলাদেশ-দুবাই (৭-৮ দিন অবস্থান)-আম্মান (জর্ডান) (ট্রানজিট)-বেনগাজী (লিবিয়া)-ত্রিপলী (লিবিয়া) রুট ব্যবহৃত হতো। এ ছাড়া পাচারকারীরা অন্য আরেকটি রুটে প্রথমে সড়ক ও বিমানপথ ব্যবহার করে লিবিয়া পৌঁছায়। সর্বশেষ লিবিয়া থেকে নৌপথে তিউনিসিয়ার উপকূল হয়ে ইউরোপে পাচার করে। সম্প্রতি পারস্য উপসাগরে বেশকিছু মৃত্যু ও নজরদারি কঠোর হওয়ায় পাচারকারীরা নতুন রুট হিসেবে বলকান অঞ্চলকে বেছে নিয়েছে।

বলকান অঞ্চল ইউরোপের প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত। বুলগেরিয়া থেকে পূর্ব সার্বিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত বলকান পর্বতমালার নামে এ অঞ্চলটির নামকরণ করা হয়েছে ‘বলকান’। সমগ্র আলবেনিয়া, বসনিয়া অ্যান্ড হার্জেগোভিনা, মেসিডোনিয়া, মন্টিনিগ্রো, গ্রিস, কসোভো, সার্বিয়া, ক্রোয়েশিয়া, রোমানিয়া ও হাঙ্গেরির সামান্য অংশ বলকানের অন্তর্গত।

গ্রিস থেকে মেসিডোনিয়া হয়ে কিংবা গ্রিস থেকে আলবেনিয়া ও কসোভো, মন্টিনিগ্রো, বসনিয়া অ্যান্ড হার্জেগোভিনা হয়ে প্রথমে সবাই সার্বিয়ায় ঢোকার চেষ্টা করে। সার্বিয়ায় প্রবেশের পর সেখান থেকে দুভাবে ইতালি, স্পেন, ফ্রান্স, পর্তুগালসহ সেনজেনের অন্তর্ভুুক্ত দেশে প্রবেশ করা যায়। প্রথমটি হচ্ছে হাঙ্গেরি হয়ে। হাঙ্গেরির সঙ্গে সরাসরি সার্বিয়ার সীমান্ত সংযোগ রয়েছে। অন্যটি হচ্ছে সার্বিয়া থেকে ক্রোয়েশিয়া হয়ে স্লোভেনিয়া। এ ছাড়া বসনিয়া অ্যান্ড হার্জেগোভিনা কিংবা মন্টিনিগ্রো থেকে ক্রোয়েশিয়া; অতঃপর ক্রোয়েশিয়া থেকে স্লে­াভেনিয়াÑ এভাবেও অনেকে সেনজেনের কোনো রাষ্ট্রে প্রবেশের চেষ্টা করেন। সেনজেনে প্রবেশ করতে পারলে সহজে এই তালিকার অন্তর্ভুক্ত কোনো রাষ্ট্রে যাতায়াত করা যায়। বিশেষ করে সীমান্ত উন্মুক্ত থাকায় এবং একই সঙ্গে সীমান্তবর্তী এলাকায় চেক পড়ার আশঙ্কা না থাকায় সড়ক ও রেলপথে সহজে সেনজেনভুক্ত এক রাষ্ট্র থেকে অন্য রাষ্ট্রে যাওয়া যায়। অনেকে তুরস্ক থেকে গ্রিসে না গিয়ে বুলগেরিয়ায় প্রবেশের চেষ্টা করেন এবং বুলগেরিয়া থেকে রোমানিয়া অথবা ইউক্রেন হয়ে হাঙ্গেরি কিংবা বুলগেরিয়া থেকে সার্বিয়া হয়ে হাঙ্গেরি অথবা ক্রোয়েশিয়ার উদ্দেশে যাত্রা করেন।

ইউরোপীয় সীমান্ত ও উপকূলরক্ষী সংস্থা, ফ্রন্টেক্সের তথ্যমতে, চলতি বছরের প্রথম চার মাসে পঞ্চিমাঞ্চলীয় বলকান রাষ্ট্রগুলো হয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোয় অবৈধভাবে সীমান্ত পাড়ির ঘটনা ৬০ শতাংশ বেড়েছে। তাদের মতে, এ সময়ে প্রায় ৬ হাজার অবৈধ অভিবাসী ছয়টি পশ্চিম বলকান দেশের মধ্য দিয়ে ইইউয়ে প্রবেশ করেছে। এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে অভিবাসীদের প্রবেশ ঠেকাতে ক্রোয়েশিয়া সীমান্তে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করেছে স্লে­াভেনিয়া। সীমান্তে পাঠানো প্রায় এক হাজার পুলিশ কর্মকর্তা সেখানে থাকা সীমান্ত পর্যবেক্ষণ ইউনিটগুলোকে সহায়তা করবে। অভিবাসন ও নিরাপত্তা খাতে পশ্চিমা বলকান অংশীদারদের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইউরোপীয় কাউন্সিল। অভিবাসননীতি এবং সীমান্ত পরিচালনা অর্জনের ক্ষেত্রে কাউন্সিল তাদের সহযোগিতা দিয়ে যাওয়ারও ঘোষণা দেওয়া হয়।

মার্কিন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে কমপক্ষে ৪ হাজার ৪০৭টি মানবপাচারবিষয়ক মামলা ছিল, যা ২০১৯ সালের শেষদিকে তদন্ত বা বিচারাধীন ছিল এবং দ-িত হওয়ার হার ১.৭ শতাংশ। ২০১৮ সালে মোট মামলা হয় ৫৪৭টি আর ২০১৯ সালে মামলা হয় ৬৪৪টি। লিবিয়ায় ৩০ অভিবাসী শ্রমিককে হত্যার পর মানবপাচারের বিরুদ্ধে বড় ধরনের অভিযানে বাংলাদেশে অন্তত ৫০ জনকে গ্রেপ্তারের বিষয়টি উঠে আসে মার্কিন প্রতিবেদনে। গ্রেপ্তারকৃতরা মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিদেশে পাঠানোর নামে মানুষ থেকে অর্থ আদায় করত।

মানবপাচার সূচকে মানবপাচারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে উন্নতি করেছে বাংলাদেশ। মার্কিন প্রতিবেদনে তা-ই বলা হয়েছে। অভ্যন্তরীণ এবং বিদেশে বিভিন্ন মানবপাচারের ঘটনার সঙ্গে বাংলাদেশিদের জড়িত থাকার কারণে এবং দোষীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় তিন বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের মানবপাচার রিপোর্টে নজরদারি তালিকায় ছিল বাংলাদেশ। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর তার ২০২০ সালের ট্র্যাফিকিং ইন পারসনস (টিআইপি) প্রতিবেদনে এ বছর মানবপাচার রোধে বাংলাদেশের পরিস্থিতির উন্নতির বিষয়টি তুলে ধরা হয়। বলা হয়, নজরদারি বা ওয়াচলিস্ট থেকে উন্নীত হয়ে দ্বিতীয় স্তরে এসেছে বাংলাদেশ। রিপোর্টে চারটি ক্যাটাগরিতে দেশগুলোকে ভাগ করা হয়। ক্যাটাগরিগুলো হচ্ছে- প্রথম স্তর, দ্বিতীয় স্তর, নজরদারি বা ওয়াচলিস্ট এবং তৃতীয় স্তর।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. একে আবদুল মোমেন বলেন, টায়ার টু ওয়াচ লিস্টে চলে যাওয়ায় আমাদের অনেক ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। আমরা মার্কিন এইড এবং ওয়ার্ল্ড ব্যাংক ও আইএমএফের সহজশর্তের ঋণ থেকে বঞ্চিত হতাম। সুখের খবর, অবস্থার উন্নতি হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর মানবপাচার রোধে জিরো টলারেন্স দেখানোর কারণে। .

নিউজটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর..

© All rights reserved © 2019 WeeklyBangladeshNY.Net
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com