শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০৮:৩৫ অপরাহ্ন

মেগা প্রকল্পে দৃশ্যমান উন্নতি হলেও বাড়ে অদৃশ্য বৈষম্য

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ৭ ডিসেম্বর, ২০১৯
  • ৭০ বার

আমার সবচেয়ে অস্বস্তির জায়গা হলো আমাদের দেশে যেসব মেগা প্রকল্প গ্রহণ করা হচ্ছে সেগুলো পুঁজিঘন বা ক্যাপিট্যাল ইনটেনসিভ। অথচ বিশাল জনসংখ্যার অধিকারী স্বল্প আয়তনের এই দেশটির দরকার ছিল শ্রমঘন প্রকল্প। এই চিত্র শুধু বাংলাদেশ নয়, অনেক উন্নয়নশীল দেশেরই। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর পৃথিবীকে অর্থনৈতিক পঙ্গুত্বের হাত থেকে মুক্তি দিতে ধনী দেশগুলোর পরামর্শ, প্রত্যক্ষ সহযোগিতা ও নিয়ন্ত্রণে বিশ্বব্যাংকসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা গড়ে ওঠে। এসব সংস্থা বিশেষ করে গরিব দেশগুলোকে ঋণদানের মাধ্যমে বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়নে সাহায্য করে, যাতে তারা দরিদ্র্রের নাগপাশ থেকে মুক্তি পায়। কিন্তু দেখা গেছে, ১৯৪৪ সাল থেকে দীর্ঘ ৭৫ বছরেও এদের সাহায্য ও পরামর্শ নিয়ে খুব কম দেশই দারিদ্র্য থেকে মুক্তি পেয়ে উন্নত দেশের কাতারে শামিল হতে পেরেছে। আসলে সাহায্যের ছদ্মাবরণে দাতারা তৃতীয় বিশ্বে এমন সব অপরাধ করছে যে কারণে দেশগুলো আরো বেশি সাহায্যনির্ভর হয়ে পড়ছে। এসব দেশের জনগণ আরো দরিদ্র হয়েছে, তাদের দুর্ভোগ আরো বেড়েছে। আন্তর্জাতিক সাহায্য ও অনুদানের ক্ষেত্রে প্রায়ই বলা হয়ে থাকে যে, এসব অনুদান প্রকৃতপক্ষে ধনী দেশের গরিব কর দাতার অর্থ, যা গরিব দেশের ধনীদের দেয়া হয়। বৈশ্বিক ঋণদানকারী সংস্থাগুলো একটি দেশের সংস্কৃতি থেকে উন্নয়নকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। দেশীয় সংস্কার প্রক্রিয়ায় বাধা দেয়। সর্বোপরি কোনো দেশের পরিবেশের ক্ষতিকে এরা তোয়াক্কা করে না। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম হয়নি।

বাংলাদেশ এখনো স্বল্পোন্নত দেশ। সংজ্ঞা অনুযায়ী, যাদের ম্যানুফেকচারিং খাত দুর্বল তারাই স্বল্পোন্নত দেশ। আমরা মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার স্বপ্ন দেখছি। কিন্তু দেশে যেভাবে উন্নয়ন হচ্ছে তার সাথে ওই স্বপ্ন পূরণের জন্য কাজের বৈপরীত্য রয়েছে। আঙ্কটাড (United Nations Conference on Trade and Development)-এর সংজ্ঞা অনুযায়ী এই তালিকা থেকে বের হতে হলে জিডিপির ১০ শতাংশ ম্যানুফেকচারিং খাত থেকে অর্জিত হতে হবে। আমাদের আয়ের প্রধান উৎস হলো শ্রমিক, শ্রম। ম্যানুফেকচারিং নয়। আমাদের জিডিপির একটা বড় অংশ আসে পোশাক তৈরি থেকে, শিল্পপণ্য থেকে নয়। আমাদের সস্তা শ্রম বিদেশে রফতানি হচ্ছে। তাদের রেমিট্যান্স থেকে দেশের আয় হচ্ছে। স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের কথা বলা হলে রফতানি থেকে আয়ের প্রশ্ন আসবে। দেখা হবে আমরা কী রফতানি করতে পারছি! আর রফতানি তখনই করতে পারব যখন আমাদের ম্যানুফেকচারিং খাতের সামর্থ্য বাড়বে এবং আমরা প্রতিযোগিতামূলক দক্ষতা বাড়াতে পারব। বিশ্ববাজারে কতটা টিকতে পারছি তার ওপর নির্ভর করবে আমরা কতটা প্রতিযোগিতামূলক। বিশ্বের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় আমাদের দেশের একজন ছাত্রকে কতটা মূল্যায়ন করছে তার ওপর নির্ভর করবে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার মান কতটা উন্নত। আমরা যখন কোনো পণ্য রফতানি করতে পারব তখনই বুঝতে পারব ওই পণ্যটির ক্ষেত্রে আমাদের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানের উন্নতি হয়েছে। আমাদের ম্যানুফেকচারিং সেক্টরের সামর্থ্য বেড়েছে, উৎপাদনশীলতা বেড়েছে।

এই একটি দিক পর্যবেক্ষণ করলে আমাদের দেশে সন্তোষজনক কোনো দৃশ্য চোখে পড়ে না। রফতানির তুলনায় আমাদের আমদানি এখনো অনেক বেশি। আমরা এখনো আমদানি পণ্যের বিকল্প তৈরি করতে পারিনি। আমদানি বিকল্প মানে হলো যে পণ্যটি আমি আমদানি করছি তা আর করার দরকার নেই। তার বিকল্প আমরা দেশেই তৈরি করছি। দেশে তৈরি পণ্যটি হতে হবে গুণে ও মানে অন্তত আমদানি করা পণ্যের কাছাকাছি এবং দামে তুলনামূলক কম। এখন আমাদের দেখতে হবে আমরা যেসব মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করছি সেগুলো আমাদের ওই প্রতিযোগিতমূলক অবস্থান উন্নত করছে কি না। মেট্রোরেল, এক্সপ্রেসওয়ে, টানেল সড়ক এগুলো দৃশ্যমান উন্নতি করছে। কিন্তু এতে অদৃশ্য বৈষম্যও বেড়ে যাচ্ছে। বড় বড় পুঁজিঘন প্রকল্পগুলোর যে একেবারেই দরকার নেই সে কথা আমি বলছি না। আমি বলছি এর পাশাপাশি আমাদের এই শ্রমঘন দেশে কী ধরনের শ্রমঘন প্রকল্প নেয়া হচ্ছে সেটি দেখতে হবে। আমরা বিদেশে জনশক্তি পাঠাচ্ছি। অথচ এদের বড় অংশ অদক্ষ বা আধাদক্ষ। তাদের দক্ষ করার ব্যবস্থা কেন আমরা করছি না?

দক্ষতা উন্নয়নের কাজটিই হলো উন্নয়ন। উন্নয়নের সূত্র বলে: কোনো দেশ যত উন্নত হবে, তার জনশক্তির মানও তত উন্নত হবে। এরজন্য প্রশিক্ষণ, পুনর্প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হয়। এর ওপর আমরা কতটা গুরুত্ব দিচ্ছি? আমাদের শিক্ষার্থীরা যে শিক্ষা পাচ্ছে সেটি কতটা যুগোপযোগী বা বাস্তবতার সাথে এর কতটা যোগ রয়েছে তা দেখতে হবে। এর জন্য পুরনো শিক্ষা (Education) শিক্ষার্থীর মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে দিয়ে (De-education) নতুন করে শিক্ষা নিতে হবে (Re-education)। তাই আমরা যদি মধ্যম আয়ের দেশের কাতারে যেতে চাই তাহলে শুধু এসব মেগা প্রজেক্টের পেছনে বিপুল অর্থ ব্যয় না করে জনশক্তির দক্ষতা বৃদ্ধির দিকে মনযোগী হতে হবে। এর জন্য ব্যাপকভাবে অনানুষ্ঠানিক শিক্ষা (Non-formal) ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। অর্থাৎ আমাদের মানবসম্পদের উন্নয়ন ঘটাতে হবে। আমাদের জনশক্তির মান উন্নত হলে আমাদের প্রতিযোগিতামূলক সামর্থ্যও বেড়ে যাবে।

আমরা যদি দেশের করপোরেট সেক্টরের দিকে তাকাই তাহলে দেখব সেগুলোর ব্যবস্থাপনা ক্রমেই অন্য দেশের নাগরিকরা দখল করে নিচ্ছে। বিশেষ করে বিপুলসংখ্যক ভারতীয় নির্বাহী এখন এদেশে কাজ করছে। আছে চীনারাও। বাংলাদেশীরা কেন প্রতিযোগিতা করে সেখানে যেতে পারছে না? এর সাধারণ উত্তর হলো তারা যোগ্য নয় বা কম যোগ্য। দেশে যখন এই অবস্থা তখন বিশ্বের জনশক্তি বাজারে বাংলাদেশীদের অবস্থা ভালো হওয়ার কথা নয়। উন্নয়ন গতিশীলতায় (development dynamics) বহু চাকরি আসবে, আবার চলেও যাবে। আর তাই পুনর্প্রশিক্ষণের প্রয়োজন হয়। বিষয়টি বোঝার জন্য বলছি : এই ২০ বছর আগেও আমাদের অফিসগুলোতে টাইপরাইটার ছিল। তারপর আসে ইলেকট্রনিক টাইপরাইটার। এখন তো কম্পিউটারও কয়েক প্রজন্ম পার করে ফেলেছে। জেরক্স বা সাইক্লোস্টাইল মেশিন বিদায় নিয়েছে বেশি দিন হয়নি। হাতে চিঠি লেখার চল প্রায় উঠে গেছে। বার্তা বিনিময়ের জন্য এখন আর কেউ টেলিগ্রাম পাঠায় না। স্টেনোগ্রাফার চেয়ে এখন আর চাকরির বিজ্ঞাপন দেয়া হয় না। একসময় স্কুলে শর্টহ্যান্ড নামে একটি বিষয় ছিল। এখন নেই। মাত্র দুই থেকে তিন দশকের মধ্যে এই বিপুল পরিবর্তন এসেছে আমাদের দৈনন্দিন জীবনের কর্মকাণ্ডে। এসব কিছুই কর্মক্ষেত্রের সাথে জড়িত। ফলে একসময় যে কর্র্মীটি টাইপরাইটারের প্রশিক্ষণ নিয়েছিল, সে যদি এখন কম্পিউটারের পুনর্প্রশিক্ষণ না নেয় তাহলে শ্রমবাজারে টিকবে না। বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে প্রতিটি ক্ষেত্রেই এটা সত্য। তাহলে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে কি আমরা এমন কোনো উপাদান যোগ করতে পেরেছি যে আমাদের জনবল ক্রমাগত প্রশিক্ষণ ও পুনর্প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে থাকবে, যেন তারা যুগের অগ্রগতির সাথে তাল মিলিয়ে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারে? এর পেছনে আমরা কত ব্যয় করছি?

উন্নতি একটি বহুমাত্রিক বিষয়। দেখতে হবে এর চূড়ান্ত সুফলটি কে পাচ্ছে। সেটিই নির্ধারণ করবে আমরা কতটা উন্নত হতে পেরেছি। যেসব মেগা প্রকল্প নেয়া হচ্ছে সেগুলোর সুফল দেশের কত শতাংশ মানুষ ভোগ করছে সেটি হবে বিবেচ্য বিষয়। এতে বরং অভ্যন্তরীণ অভিবাসন বেড়ে যাবে। এমনিতেই ঢাকা শহর বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। বিশ্বে বসবাসের অযোগ্য শহরের যে তালিকা সম্প্রতি প্রকাশ করা হয়েছে তাতে ঢাকার অবস্থান তৃতীয়; যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়ার রাজধানী দামেস্ক ও নাইজেরিয়ার লাগোস শহরের পরেই। মেট্রেরেলের মতো প্রকল্পগুলো নিশ্চিতভাবে ঢাকাকে বসবাসের আরো অযোগ্য করে তুলবে। যেসব প্রকল্পে সাধারণ মানুষের উন্নয়ন হয় না এমন প্রকল্প দিয়ে দেশের উন্নয়ন করা যায় না।

তাই আমাদেরকে এসব মেগা অবকাঠামোর পাশাপাশি গ্রামীণ অবকাঠামোর দিকে মনযোগ দিতে হবে। বর্তমানে শহরমুখী জনসংখ্যার যে প্রবাহ তৈরি হচ্ছে তা নাগরিক পরিষেবার ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। এতে কোনো নাগরিকই সুষ্ঠুভাবে সেবা পাচ্ছেন না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের উন্নয়ন করতে চাচ্ছেন। কিন্তু মেগা প্রকল্পগুলো দিয়ে গ্রামীণ উন্নয়নের সম্ভাবনা ক্ষীণ। শহরভিত্তিক উন্নয়ন হচ্ছে কিন্তু গ্রাম পিছিয়ে থাকছে। এই অবস্থার পরিবর্তনের জন্য উন্নয়নকেও উল্টোমুখী করতে হবে। বর্তমানে উন্নয়নের ধারা শুরু হয় শহর থেকে আর শেষ হয় গিয়ে গ্রামে। কিন্তু এই ধারা যদি গ্রাম থেকে শুরু করে শহরে এনে ঠেকানো যায় তাহলে গোটা দেশের চেহারা পাল্টে যাবে এবং উন্নয়ন হবে সুষম। তখন কর্মসংস্থানের জন্য মানুষ আর শহরের দিকে ছুটবে না, বরং উল্টোটা ঘটবে। মানুষ শহর ছেড়ে গ্রামে গিয়ে বসবাসে উৎসাহিত হবে। যে হকারটিকে পিটিয়ে শহরের ফুটপাথ থেকে উচ্ছেদ করা হচ্ছে তখন সে আর শহরে আসবে না।

আমাদের বর্তমান উন্নয়ন প্রক্রিয়াটি হচ্ছে সাবেক ঔপনিবেশিক ধ্যান-ধারণার ফসল। কিন্তু নতুন শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় চাই বিকল্প চিন্তাধারা, বিকল্প উন্নয়ন মডেল। এরই অংশ হিসেবে আমি সোস্যাল ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকের চেয়ারম্যান থাকাকালে ‘সবুজ হাট প্রকল্প’ ধারণা তুলে ধরেছিলাম। এটা এমন এক নতুন ধারার ব্যাংকিং যেখানে আনুষ্ঠানিক, অনানুষ্ঠানিক ও স্বেচ্ছামূলক ব্যাংকিং কার্যক্রমের সমন্বয় ঘটেছে। অর্থের প্রবাহ গ্রাম থেকে শহরমুখী না করে শহর থেকে গ্রামমুখী করার কথা ভাবা হয়েছে। আমাদের দেশে যে হাজার হাজার ওয়াকফকৃত বা জনকল্যাণে দান করা সম্পত্তি অযত্ন-অবহেলায় অনুৎপাদনশীল অবস্থায় পড়ে আছে সেগুলোকে উৎপাদনশীল ধারায় ফিরিয়ে আনার জন্য এই প্রকল্পের প্রস্তাব করা হয়। এর মাধ্যমে যেমন সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত হবে, তেমনি দেশীয় পুঁজি সমাবেশের মাধ্যমে দারিদ্র্যবিমোচন ও উন্নয়নের দ্বার উন্মুক্ত হবে। সেই সাথে বিদেশী সাহায্যনির্ভরতাও কমবে। ব্যাংক থেকে এই প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন না পাওয়ায় তা আর বাস্তবায়ন করা যায়নি। তবে এর প্রাসঙ্গিকতা এখনো ফুরিয়ে যায়নি। এটা গ্রামীণ উন্নয়নের অনেক ভালো বিকল্প বলে আমি মনে করি।

লেখক : প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড; সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ, ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক, জেদ্দা

নিউজটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর..

© All rights reserved © 2019 WeeklyBangladeshNY.Net
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com