শুক্রবার, ২৭ নভেম্বর ২০২০, ০১:৪১ পূর্বাহ্ন

দুই খলনায়কের ফাঁসি কবে

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ১৪ ডিসেম্বর, ২০১৯
  • ৬৫ বার

বুদ্ধিজীবী হত্যার দুই খলনায়ক ও প্রধান পরিকল্পনাকারী চৌধুরী মঈনুদ্দীন ও আশরাফুজ্জামান খান। বাঙালি জাতিকে মেধাশূন্য করার পরিকল্পনার নেতৃত্ব দিয়েছেন তারা। দেশ স্বাধীন হওয়ার ৪২ বছর পর বিচার হয়েছে তাদের। ফাঁসির আদেশও হয়েছে। এর পরও কেটে গেছে ৬ বছর। ফাঁসি এখনো কার্যকর হয়নি। কবে তাদের ফাঁসির রায় কার্যকর হবে, তা কেউই বলতে পারছে না। এ দুই ঘাতক দীর্ঘদিন ধরে বিদেশে বসে বিলাসী জীবনযাপন করছেন।

বুদ্ধিজীবী হত্যার ফাঁসির সাজাপ্রাপ্ত চৌধুরী মঈনুদ্দীন ও আশরাফুজ্জামান খানকে দেশে ফিরিয়ে এনে আদালতের রায় কার্যকর করতে ইন্টারপোলের শরণাপন্ন হয়েছিল সরকার। কিন্তু ৬ বছর পেরিয়ে গেলেও তাদের ফিরিয়ে আনার কাজে কোনো অগ্রগতি নেই।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক আমাদের সময়কে জানান, ‘তাদের দেশে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। আমরা তাদের ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করে যাচ্ছি।’ তবে এ চেষ্টা কবে শেষ হবে তা কেউই নিশ্চিত নয়। এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে, এ দুই ঘাতকের ফাঁসি কবে কার্যকর হবে তা নিয়ে। হতাশা প্রকাশ করেছেন শহীদ বুদ্ধিজীবী পরিবারের সদস্যরাও।

জানতে চাইলে শহীদ ডা. আবদুুল আলিম চৌধুরীর মেয়ে ডা. নূজহাত চৌধুরী বলেন, যে দুটি দেশে তারা রয়েছে, তারা মৃত্যুদ-কে সাপোর্ট করে না। তারা মানবাধিকারের দোহাই দিয়ে ফেরত দিতে চাইছে না। এ ব্যাপারে আমার বক্তব্য হচ্ছে- একটি বিচারিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে তাদের ফাঁসি হয়েছে। সেটা তারা কার্যকর করতে দিচ্ছে না মানবাধিকারের দোহাই দিয়ে। একজনের মানবাধিকার দেখতে গিয়ে তারা আমাদের মতো ৩০ লাখ শহীদের পরিবারের মানবাধিকার লঙ্ঘন করছে। তিনি আরও বলেন, এ সরকার ৪০ বছর পর হলেও বিচার করেছে। তাই তারা যে বিচারের রায় কার্যকর করবে, সেই আশা আছে। আমি জানি, দুই আসামিকে ফিরিয়ে আনতে নেগোশিয়েট করছে। এটা চলমান আছে। প্রকাশ্যে অগ্রগতি না হলেও ভেতরে ভেতরে প্রক্রিয়া চলমান। এ প্রক্রিয়া আরও বেগবান করতে হবে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা জোরদার করার মাধ্যমে।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এ দেশে ইতিহাসের নারকীয় হত্যাযজ্ঞ শুরু করে। সেই কালরাতে শুরু হওয়া গণহত্যায় নয় মাসে সারাদেশ পরিণত হয় বধ্যভূমিতে। মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত বিজয়ের মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে ১৪ ডিসেম্বর বাঙালি জাতিকে মেধাশূন্য করতে পাকিস্তানি বাহিনী তাদের দোসর আলবদরের সহায়তায় শিক্ষক, সাংবাদিক, চিকিৎসক, সংস্কৃতিকর্মীসহ বিভিন্ন পেশার বরেণ্য ব্যক্তিদের খুঁজে খুঁজে হত্যা করে।

মুক্তিযুদ্ধের সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নয় শিক্ষক, ছয় সাংবাদিক ও তিন চিকিৎসকসহ ১৮ বুদ্ধিজীবীকে অপহরণের পর হত্যার মূল হোতা আলবদর নেতা চৌধুরী মঈনুদ্দীন ও আশরাফুজ্জামান খান বিদেশে পালিয়ে যায়। ২০১৩ সালের ৩ নভেম্বর বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের নেতৃত্বাধীন ট্রাইব্যুনাল-২ তাদের দুজনকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদ- নিশ্চিত করার আদেশ দেন। তাদের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের ১১টি অভিযোগই প্রমাণিত হয়। সব অভিযোগেই একমাত্র সাজা ‘মৃত্যুদ-’ দেওয়া হয়। ওই রায়ে বলা হয়, একাত্তরে বুদ্ধিজীবী হত্যাকা-ের সঙ্গে জড়িত সবাইকে খুঁজে বের করা সম্ভব নয়। তবে ওই হত্যাকা-ের মূল নায়ক ছিলেন চৌধুরী মঈনুদ্দীন ও আশরাফুজ্জামান খান। বাঙালি জাতিকে মেধাশূন্য করার পরিকল্পনার নেতৃত্ব দিয়েছেন তারা। এ নৃশংস অপরাধের জন্য তারা ‘শুধু এবং শুধুমাত্র’ ফাঁসির যোগ্য। তাদের মৃত্যুদ- না হলে ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবে না। দুই আসামির আত্মসমর্পণ অথবা গ্রেপ্তারের পর এ সাজার রায় কার্যকর করা হবে। এ জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে সাজা পরোয়ানার একটি কপি পুলিশ মহাপরিদর্শক ও একটি কপি ঢাকার জেলা ম্যাজিস্ট্রেট বরাবর পাঠানো হয়।

রায়ের পর্যবেক্ষণে ট্রাইব্যুনাল বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি, জামায়াতে ইসলামীর মস্তিষ্কপ্রসূত ঘাতক বাহিনী আলবদর একাত্তরে বুদ্ধিজীবী নিধনের যে নীলনকশা বাস্তবায়ন করেছে, তা গোটা জাতির বুকে ক্ষত হয়ে আজও রক্ত ঝরাচ্ছে। আমরা আরও বিশ্বাস করি, গত চার দশকে মাটির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের হত্যাকারীদের বিচার করতে না পারায় জাতি হিসেবে আমরা লজ্জিত; এ লজ্জা আমাদের ক্ষতকে দিন দিন বাড়িয়ে তুলেছে। বুদ্ধিজীবী হত্যাযজ্ঞ বাঙালি জাতিকে চিরদিন নিদারুণ যন্ত্রণাই দিয়ে যাবে।’

১৯৭১ সালের ১১ থেকে ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে জামায়াতে ইসলামীর তখনকার ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘের কেন্দ্রীয় নেতা আশরাফুজ্জামান ও মঈনুদ্দীন আলবদর সদস্যদের নিয়ে বুদ্ধিজীবীদের অপহরণ ও হত্যার পর বধ্যভূমিতে লাশ গুম করেছিলেন। আশরাফুজ্জামান খান ছিলেন সেই হত্যাকা-ের ‘চিফ এক্সিকিউটর’। আর চৌধুরী মঈনুদ্দীন ছিলেন সেই পরিকল্পনার ‘অপারেশন ইনচার্জ’। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর আশরাফুজ্জামানের নাখালপাড়ার বাসা থেকে উদ্ধার করা তার ব্যক্তিগত দিনপঞ্জিতে এ হত্যা পরিকল্পনার একটি তালিকাও পাওয়া যায়।

তার মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও নাট্যকার মুনীর চৌধুরী, অধ্যাপক মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, গিয়াসউদ্দিন আহমেদ, ড. সিরাজুল হক খান, ড. মো. মর্তুজা, ড. আবুল খায়ের, ড. ফয়জুল মহিউদ্দিন, অধ্যাপক রাশিদুল হাসান, অধ্যাপক আনোয়ার পাশা ও ড. সন্তোষ ভট্টাচার্য, সাংবাদিক সিরাজ উদ্দিন হোসেন, সৈয়দ নাজমুল হক, এএনএম গোলাম মুস্তাফা, নাজিম উদ্দিন আহমেদ, সেলিনা পারভীন, শহীদুল্লাহ কায়সার এবং চিকিৎসক মো. ফজলে রাব্বী ও আলিম চৌধুরীকে হত্যার অভিযোগে তাদের ফাঁসি দেন আদালত।

চৌধুরী মঈনুদ্দীনের জন্ম ১৯৪৮ সালের নভেম্বরে, ফেনীর দাগনভূঞা থানার চাঁনপুর গ্রামে। তার বাবার নাম দেলোয়ার হোসাইন। একাত্তরে মঈনুদ্দীন ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলার ছাত্র। দৈনিক পূর্বদেশের নিজস্ব প্রতিবেদক হিসেবেও তিনি কাজ করেছেন। মামলার নথিপত্র অনুযায়ী, মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোতে মঈনুদ্দীন ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর তখনকার সহযোগী সংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘের কেন্দ্রীয় নেতা এবং রাজাকার বাহিনীর সদস্য। সে হিসেবে পাকিস্তানি হানাদারদের সহযোগিতার জন্য গড়ে তোলা আলবদর বাহিনীতেও তাকে ‘গুরুত্বপূর্ণ’ দায়িত্ব দেওয়া হয়। যুদ্ধের শেষভাগে বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবী হত্যার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের নেতৃত্বে ছিলেন তিনি। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর মঈনুদ্দীন পালিয়ে পাকিস্তান চলে যান। সেখান থেকে যান যুক্তরাজ্যে। এখন পর্যন্ত তিনি লন্ডনেই আয়েশি জীবনযাপন করছেন। লন্ডনে জামায়াতের সংগঠন দাওয়াতুল ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি লন্ডনভিত্তিক সাপ্তাহিক দাওয়াতের বিশেষ সম্পাদকের দায়িত্বও তিনি পালন করেছেন। মঈনুদ্দীন ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসের একজন পরিচালক, মুসলিম এইডের ট্রাস্টি এবং টটেনহ্যাম মসজিদ পর্ষদের চেয়ারম্যানের দায়িত্বে আছেন।

আশরাফুজ্জামান খানের জন্ম ১৯৪৮ সালে, গোপালগঞ্জের মুকসুদপুরের চিলেরপাড় গ্রামে। বাবার নাম আজহার আলী খান। ১৯৬৭ সালে সিদ্ধেশ্বরী ডিগ্রি কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাসের পর আশরাফুজ্জামান ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামী স্টাডিজ বিভাগে। মুক্তিযুদ্ধের সময় ঢাকা আলবদর বাহিনীকে নেতৃত্ব দেওয়ার দায়িত্ব আশরাফুজ্জামানের ওপর বর্তায়। বুদ্ধিজীবী হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী এবং বাস্তবায়নকারী নেতা হিসেবেও তাকে অভিযুক্ত করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। মামলার নথিতে বলা হয়েছে, আশরাফুজ্জামান ছিলেন আলবদর বাহিনীর গাজী সালাউদ্দিন কোম্পানির কমান্ডার। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি পালিয়ে পাকিস্তানে চলে যান এবং কিছুদিন রেডিও পাকিস্তানে কাজ করেন। পরে সেখান থেকে চলে যান যুক্তরাষ্ট্রে। বর্তমানে আশরাফুজ্জামান খানের ঠিকানা নিউইয়র্কের জ্যামাইকা। ইসলামিক সার্কেল অব নর্থ আমেরিকার সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি।

নিউজটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর..

© All rights reserved © 2019 WeeklyBangladeshNY.Net
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com