বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২০, ১১:৪১ অপরাহ্ন

ডিসিসি নির্বাচন শুরুতেই বিধি লঙ্ঘন

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১ জানুয়ারী, ২০২০
  • ৪৩ বার

ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মনোনয়নপত্র দাখিলের সময় শেষ হয়েছে গতকাল মঙ্গলবার। দুই সিটিতে ৭ জন করে ১৪ জন মেয়রপ্রার্থী মনোনয়ন দাখিল করেছেন। মেয়র, সাধারণ কাউন্সিলর ও সংরক্ষিত কাউন্সিলর মিলিয়ে ১ হাজার ৩০টি মনোনয়ন দাখিল করা হয়। মনোনয়ন দাখিলের শেষ দিনে আচরণবিধি লঙ্ঘন করেছেন মেয়রপ্রার্থী আতিকুল ইসলাম এবং বিএনপি মনোনীত প্রার্থী তাবিথ আউয়াল।

নির্বাচনে অংশগ্রহণের শুরুতেই এমন আচরণবিধি লঙ্ঘন করলেও রিটার্নিং অীফসারকে কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা উত্তরের রিটার্নিং অফিসার মো. আবুল কাসেম আমাদের সময়কে বলেন, আমি দুই মেয়রপ্রার্থীর মনোনয়ন জমা নেওয়ার সময় অনেক লোককে আসতে দেখেছি। জিজ্ঞাসা করেছি তাদের সঙ্গে ৫ জনের বেশি আসছে কিনা। তখন প্রার্থীরা বলেন, তারা কম এসেছেন। বাকিরা সমর্থক অথবা সাংবাদিক হতে পারেন বলে প্রার্থীরা জানিয়েছেন। এ কারণে আমি তেমন কিছু বলিনি।

সিটি করপোরেশন নির্বাচন আচরণবিধিমালার ১১ নম্বর ধারায় বলা আছে ‘মনোনয়নপত্র সংগ্রহ ও দাখিলের সময় কোনো প্রকার মিছিল কিংবা শো-ডাউন করা যাইবে না বা প্রার্থী ৫ জনের অধিক সমর্থক লইয়া মনোনয়নপত্র সংগ্রহ ও জমা দিতে পারবেন না।’ শাস্তি বিষয়ে এই বিধিমালার ৩০ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, কোন প্রার্থী বা তাহার পক্ষে অন্য কোনো ব্যক্তি নির্বাচন-পূর্ব সময়ে এই বিধিমালার বিধান লঙ্ঘন করিলে অনধিক ৬ মাস কারাদ- অথবা অনধিক ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয়দণ্ডে দণ্ডনীয় হইবেন।

ইসি কর্মকর্তারা জানান, প্রার্থীরা বারবার আচরণবিধি লঙ্ঘন করলেও অজানা কারণে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। এতে ইসির ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সোমবার সকাল থেকেই কিছু প্রার্থী ৫ জনের বেশি লোকজন নিয়ে উত্তর সিটির রিটার্নিং অফিসারর কার্যালয়ে আসেন। এ ছাড়া কার্যালয়ের বাইরেও আচরণবিধি লঙ্ঘন করে প্রার্থী ও তাদের প্রতিনিধিরা জমায়েত হয়েছেন, শোডাউন করেছেন। গত সোমবার ইটিআই ভবনে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয়ে ও এর বাইরে প্রার্থীরা মনোনয়নপত্র সংগ্রহ ও জমা দেওয়ার সময় আরচণবিধি লঙ্ঘন করেছেন।

সোমবার সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয়ে আচরণবিধি লঙ্ঘনের এই চিত্র দেখা যায়। ১২টার দিকে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে ডিএনসিসি নির্বাচনের রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয়ে মনোনয়নপত্র জমা দিতে যান ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের আওয়ামী লীগ সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থী মো. সফিউল্লাহ। সঙ্গে ছিল মোটরসাইকেল ও গাড়িবহর। শতাধিক নেতাকর্মী নিয়ে তিনি এসেছিলেন মনোনয়নপত্র জমা দিতে।

এর পর দুপুরে ৮-১০টি পিকআপ, কয়েকটি বাস, গাড়ি ও মোটরসাইকেল বহর নিয়ে মনোনয়নপত্র জমা দিতে আসেন উত্তর সিটি করপোরেশনের ১৫ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর প্রার্থী মো. জহির আহমেদ। উত্তরের ২৭ নম্বর ওয়ার্ডের বর্তমান কাউন্সিলর ও আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী ফরিদুর রহমান ইরানের বড় ভাই জাবেদুর রহমান খান বেলা ৩টার দিকে ৫ জনের বেশি লোকজন নিয়ে মনোনয়নপত্র জমা দিতে আসেন।

এ বিষয়ে আবুল কাসেম বলেন, গত সোমবার যেসব কাউন্সিলরের মধ্যে আচরণবিধি লঙ্ঘন করেছে বলে গণমাধ্যমে সংবাদ এসেছে তাদের মধ্যে একজনকে আমি ডেকেছিলাম। ওই কাউন্সিলর আমাকে নিশ্চিত করেছেন ভবিষ্যতে আর তিনি কোনো আচরণবিধি লঙ্ঘন করবেন না।

গতকাল মঙ্গলবার ছিল ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি নির্বাচনের মনোনয়ন জমা দেওয়ার শেষ দিন। দুই সিটির রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয় থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুসারে, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে মেয়র পদে ৭ জন। তারা হলেন আওয়ামী লীগের আতিকুল ইসলাম, বিএনপির তাবিথ আউয়াল, জাতীয় পার্টির জিএম কামরুল ইসলাম, সিপিবির সাজেদুল হক, পিডিপির শাহীন খান, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ফজলে বারী মাসউদ, এনপিপির আনিসুর রহমান দেওয়ান। উত্তর সিটিতে সাধারণ কাউন্সিলর পদে ৩৭৪ জন ও সংরক্ষিত কাউন্সিলর পদে ৮৯ জন মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেন। সব মিলিয়ে উত্তরে মনোনয়ন জমা দিয়েছেন ৪৭০ প্রার্থী।

অন্যদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন মেয়র পদে ৭ জন। তারা হলেন আওয়ামী লীগের শেখ ফজলে নূর তাপস, বিএনপির ইশরাক হোসেন, জাতীয় পার্টির মোহাম্মদ সাইফুদ্দিন, ইসলামী আন্দোলন মো. আবদুর রহমান, এনপিপির বাহরানে সুলতান বাহার, বাংলাদেশ কংগ্রেসের মো. আকতার উজ্জামান ওরফে আয়াতুল্লা, গণফ্রন্টের আব্দুস সামাদ সুজন। এই সিটিতে সাধারণ কাউন্সিলর পদে ৪৫৪ জন ও সংরক্ষিত কাউন্সিলর পদে ৯৯ জন মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন। সব মিলিয়ে এই সিটিতে মনোনয়ন দাখিল করেছেন ৫৬০ জন।

আগামী ২ জানুয়ারি যাচাই বাছাই শেষে প্রার্থীদের তালিকা প্রকাশ করবেন রিটার্নিং অফিসাররা। রিটার্নিং অফিসারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল কর্তৃপক্ষের কাছে আপিল করা যাবে ৫ জানুয়ারি পর্যন্ত। প্রার্থিতা প্রত্যাহার ৯ জানুয়ারি, প্রতীক বরাদ্দ হবে ১০ জানুয়ারি। ভোটগ্রহণ ৩০ জানুয়ারি।

গতকাল দুপুর ১২টার দিকে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচনী প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউশন (ইটিআই) ভবনে উত্তর সিটির রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয়ে মনোনয়ন জমা দিতে আসেন মেয়রপ্রার্থী আতিকুল ইসলাম। এ সময় তার সঙ্গে শতাধিক নেতাকর্মী আসেন। তাদের ছোট একটা অংশ ইটিআই ভবনের ভেতরে প্রবেশ করে। নেতাকর্মীদের বড় অংশ ইটিআই ভবনের সামনে অবস্থান নেয়। রিটার্নিং অফিসারের কক্ষেও অতিরিক্ত লোকজন নিয়ে প্রবেশ করেন মেয়রপ্রার্থী আতিকুল ইসলাম। তখন তাদের লোকজনই ৫ জন ভেতরে থেকে বাকিদের বাইরে বেরিয়ে যেতে বলেন। বলার পরও কক্ষে ৫ জনের বেশি লোক দেখা যায়।

এরপর রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয়ের ভেতরেই সংবাদ সম্মেলন করেন আতিকুল। তখনও তার সঙ্গে ৫ জনের বেশি লোকজন অবস্থান করেন। এমনকি এক প্রশ্নে আতিকুল ইসলাম বলেও ফেলেন তার সঙ্গে অতিরিক্ত লোক রয়েছে। আতিকুল ইসলাম বলেন, এখানে আমাদের আওয়ামী লীগের সভাপতি আছেন, ঢাকা মহানগর উত্তরের বজলুর, এসএম মান্নান কচি আছেন এবং আওয়ামী লীগের অনেক নেতাকর্মীও আছেন।

এ রকম পরিস্থিতিতে সংবাদ সম্মেলনেই আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগের বিষয়ে প্রশ্ন করেন সাংবাদিকরা। জবাবে আতিকুল ইসলাম বলেন, আমরা এখানে এসেছি পাঁচজন। বাইরে থাকলেও কোনো শোডাউন হয়নি। স্লোগান হয়েছে, দৃষ্টি আকর্ষণ করলে আতিকুল ইসলাম বলেন, যখন হয়েছে, তখন সঙ্গে সঙ্গে বন্ধ করে দিয়েছি।

আতিকুল ইসলাম বলেন, আমরা অবশ্যই জনগণের ভোটে নির্বাচিত হব। সন্ত্রাসী কারচুপিতে বিশ্বাস করি না। আসন্ন ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচন সুষ্ঠু প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক হবে।

অন্যদিকে বেলা ২টার দিকে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী তাবিথ আউয়াল ইটিআই ভবনে রিটার্নিং অফিসারের কর্যালয়ে মনোনয়নপত্র জমা দিতে এসেও ৫ জনের অধিক নেতাকর্মী নিয়ে রুমে প্রবেশ করেন। এ সময় ভাবনের সামনে অনেক নেতাকর্মী অবস্থান নেন। সাংবাদিকদের প্রশ্নে তাবিথ আউয়াল বলেন, আমাদের কয়েক জন নেতা রয়েছেন; অন্য যারা এসেছেন তারা সমর্থক।

তাবিথ আউয়াল বলেন, নির্বাচন করার জন্য আপনারা অতীতেও দেখেছেন, আমরা অত্যন্ত সিরিয়াস। নির্বাচনে যত সমস্যাই আসুক, আমরা সবগুলো অতিক্রম করে চেষ্টা করব এগিয়ে যেতে। শেষ পর্যন্ত আমরা মাঠে থাকব। তার মানে এই নয় যে ভুলগুলো হতে যাচ্ছে, সেগুলো আগে থেকে মেনে নেব বা জনগণকেও মানতে দেব।

মঙ্গলবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের রিটার্নিং অফিসার মো. আবদুল বাতেনের হাতে এ মনোনয়নপত্র জমা দেন আওয়ামী লীগ প্রার্থী ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস। এ সময় তার সঙ্গে অনেক নেতাকর্মী থাকলেও স্বল্পসংখ্যক লোক নিয়ে মনোনয়ন জমা দেন। পরে শেখ ফজলে নূর তাপস বলেন, আজ নানা দুর্ভোগে নগরবাসী, বিভিন্ন সেবা থেকে তারা বঞ্চিত। তাদের নিয়ে কাজ করার সুযোগ আছে। আমাকে পরীক্ষা করে দেখুন, আপনাদের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করব।

ঢাকা দক্ষিণ সিটির রিটার্নিং অফিসারের কাছে বেলা পৌনে তিনটায় মনোনয়নপত্র জমা দেন বিএনপির মেয়রপ্রার্থী ইশরাক হোসেন। এ সময় অনেক নেতাকর্মী সাথে থাকলেও প্রথমে পাঁচজন নিয়ে মনোনয়নপত্র জমা দিতে যান। পরে আরও কয়েক জন প্রবেশ করেন।

পরে ইশরাক হোসেন বলেছেন, নির্বাচন কমিশনের (ইসি) কাছে এটি দ্বিতীয় সুযোগ। নির্বাচন কেমন হয়েছে তা ৩০ জানুয়ারির সবাই দেখেছে। তারপরও একজন প্রার্থী হিসেবে তাদের কাছে কী ধরনের আস্থা থাকতে পারে, প্রার্থী হিসেবে এ প্রশ্ন আমি জাতির কাছে রাখতে চাই। যেহেতু আরও একটা সুযোগ এসেছে তাদের ভুল সংশোধনের, আমি চাইব তারা সেটা করবেন।

দুই সিটিতে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড প্রস্তুত করার নির্দেশ ইসি

ঢাকা উত্তর ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনের লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড প্রস্তুত করার নির্দেশনা দিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগকে চিঠি দিয়েছে ইসি। মঙ্গলবার ইসির সিনিয়র সচিব মো. আলমগীর স্বাক্ষরিত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সিনিয়র সচিব মোস্তাফা কামাল উদ্দিনকে পাঠানো এক চিঠিতে এ নির্দেশনা দেওয়া হয়।

চিঠিতে বলা হয়, আগামী ৩০ জানুয়ারি ২০২০ তারিখে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য ২২ ডিসেম্বর তফসিল ঘোষণা করা হয়েছে। নির্বাচন পরিচালনার জন্য রিটার্নিং অফিসার এবং সহকারী রিটার্নিং অফিসার নিয়োগ করা হয়েছে। সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে নির্বাচন সম্পন্ন করার লক্ষ্যে কয়েকটি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন।

সিদ্ধান্তগুলো হলো- আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েনের পরিকল্পনা, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষা ও সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা বিধান, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েনের লক্ষ্যে অগ্রিম বাজেট প্রণয়ন; অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের নিয়ন্ত্রণ ও নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড প্রস্তুতকরণ এবং নির্বাচনী এলাকার সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ। নির্বাচন কমিশনের গৃহীত সিদ্ধান্ত মোতাবেক উল্লিখিত বিষয়ে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণের জন্য জননিরাপত্তা বিভাগের সিনিয়র সচিবের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়।

নিউজটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর..

© All rights reserved © 2019 WeeklyBangladeshNY.Net
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com