শুক্রবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১২:৪৯ অপরাহ্ন

করোনা ছেড়ে যাচ্ছে জটিলতা যাচ্ছে না

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ২৯ আগস্ট, ২০২০
  • ৬৬ বার

চিকিৎসায় করোনা ভাইরাস থেকে মুক্তি মিললেও পরবর্তীতে আক্রান্তদের অনেকেরই শরীরে দীর্ঘমেয়াদে নানা নেতিবাচক প্রভাব দেখা দিচ্ছে। এমনকি মানসিকভাবেও তারা মুখোমুখি হচ্ছেন নানা সমস্যার। আক্রান্ত থেকে সুস্থ হওয়া অনেকেই জানিয়েছেন, তারা মেরুদণ্ডের ব্যথা, মাথাঘোরা, দুর্বলতা, স্মৃতিভ্রম, অস্থিরতার মতো সমস্যায় ভুগছেন। আবার অনেকের মধ্যে কিডনি, লিভার ও হৃদযন্ত্রের সমস্যা দেখা দিচ্ছে। চিকিৎসকরা বলছেন, যাদের ডায়াবেটিস, উচ্চরক্তচাপ কিংবা হৃদরোগের মতো সমস্যা আছে তারাই করোনার প্রভাবে নতুন জটিলতার মুখোমুখি হচ্ছেন। অনেককেই বেগ পেতে হচ্ছে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে। এ অবস্থায় দীর্ঘ মেয়াদের নেতিবাচক প্রভাব কাটাতে বিভিন্ন হাসপাতালে করোনাপরবর্তী ফলোআপ চিকিৎসায় চালু হচ্ছে বিশেষ ক্লিনিক।

জানা গেছে, করোনাপরবর্তী সমস্যা চিহ্নিত করে চিকিৎসা প্রদানে এরই মধ্যে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে কোভিড-১৯ পরবর্তী ফলোআপ ক্লিনিক চালু হয়েছে। আজকালের মধ্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) হাসপাতালেও একই ধরনের ক্লিনিক চালু করা হবে। যেখান থেকে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরা রোগীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হবে। তাদের সমস্যার ধরন অনুযায়ী দেওয়া হবে চিকিৎসাসেবা।

সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর) তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয় গত ৮ মার্চ। ওইদিন থেকে

গতকাল শুক্রবার পর্যন্ত ১৫ লাখ ১৪ হাজার ১২৬টি নমুনা পরীক্ষার মাধ্যমে ৩ লাখ ৬ হাজার ৭৯৪ জন রোগী শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে সুস্থ হয়েছেন ১ লাখ ৯৬ হাজার ৮৩৬ জন এবং মারা গেছেন ৪ হাজার ১৭৪ জন। শনাক্ত বিবেচনায় সুস্থতার হার ৬৪.১৬ শতাংশ।

বিশেষজ্ঞরা চিকিৎসকরা বলেছেন, করোনা ভাইরাসে আক্রান্তরা একবার সুস্থ হয়ে উঠলেও দ্বিতীয়বার আক্রান্ত হওয়াসহ শরীরে নানা ধরনের জটিলতা দেখা যাচ্ছে। সাধারণ কোভিড রোগীদের এক তৃতীয়াংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, রোগপরবর্তী সময়ে তারা প্রচণ্ড দুর্বলতায় ভোগেন। এ ছাড়া কাজে অমনোযোগিতা, মানসিক বিক্ষিপ্ততা, মাথাব্যথা ও মাথা ঘোরা, হাত পা জ্বালাপোড়া ইত্যাদি সমস্যাও দেখা যায়। অনেকের ক্ষেত্রে নিকট অতীতের স্মৃতিভ্রম, নতুন কিছু শেখা বা করার ক্ষেত্রে ধীরগতি, দ্বিধা, একাকিত্ববোধ, মতিভ্রম ইত্যাদি হতে পারে। আর কোভিড হাসপাতালের বা আইসিইউর ভীতিকর স্মৃতিতে উদ্বেগে ভোগেন অনেকে। কেউ কেউ স্বজন হারানোর বেদনা বা অর্থনৈতিক চাপে বিষণ্নতায় আক্রান্ত হতে পারেন। অনেকের মধ্যে বিভিন্ন রকম মানসিক অবসাদ দেখা দিতে পারে। এ ছাড়া পুরুষদের ক্ষেত্রে সাময়িক বন্ধ্যাত্ব ও নারীদের হতে পারে গর্ভধারণজনিত জটিলতা।

একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী রেজাউল করিম রেজা জানান, তার বাবা করোনা আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়েছেন। কিন্তু এখনো তার ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে আসছে না। ইনসুলিন ব্যবহার করেও ডায়াবেটিসের মাত্রা নামছে না ১৭-এর নিচে। বিষয়টি নিয়ে তিনি খুব চিন্তায় আছেন।

বিএসএমএমইউর স্বাস্থ্যকর্মী মিনারা হোসেন জানান, করোনা আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিয়ে তিনি সুস্থ হয়েছেন। কিন্তু এখনো তার শরীর খুবই দুর্বল, মেরুদণ্ডে ব্যথা, হাত-পা অবশ মনে হয়। ঘুম ঠিকমতো হয় না, কিছু মনে হওয়ার পরপরই ভুলে যান।

মোজাম্মেল হক নামে এক গণমাধ্যম কর্মী জানান, তিনি করোনা থেকে মুক্ত হলে শরীরে এর প্রভাব রয়ে গেছে। বিশেষ করে হাঁটতে সমস্যা হচ্ছে। তাই দুই পায়ে ঊরুর নিচে অ্যাংলেট পরে চলাফেরা করছেন। এতে পায়ে একটু শক্তি পান।

এসব বিষয়ে ঢামেকের প্রিন্সিপাল অধ্যাপক ডা. খান আবুল কালাম আজাদ আমাদের সময়কে বলেন, ‘করোনা রোগীরা যখন সুস্থ হয়ে বাড়ি যাচ্ছেন তখন থেকে কতগুলো অবজারভেশন আমাদের কাছে আসছে। যেসব রোগী ভালো হয়ে যাচ্ছেন এবং তার রক্ত থেকে অ্যান্টিবডি নিয়ে আরেকজন অসুস্থ রোগীকে দিলে তিনি সুস্থ হচ্ছেন। আমরা ধরে নিলাম করোনা রোগীর শরীরে যথেষ্ট অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে আমরা দেখলাম সুস্থ রোগী দ্বিতীয়বার সংক্রমিত হচ্ছেন। একবার আক্রান্ত হয়ে সুস্থ হলেও তার অ্যান্টিবডি তাকে প্রোটেকশন দিতে পারছে না। আবার রোগীরা ভালো হয়ে যাওয়ার পর তাদের কতগুলো জটিলতা দেখা দিচ্ছে। এই জটিলতা যাদের রিস্ক ফ্যাক্টর আছে তাদেরও যেমন হচ্ছে আবার যাদের রিস্ক ফ্যাক্টর নেই তাদেরও হচ্ছে। যাদের রিস্ক ফ্যাক্টর নেই তাদের মনস্তাত্ত্বিক সমস্যা হচ্ছে। তারা বিষণ্নতা, মতিভ্রম, অস্থিরতায় ভুগছেন। কতগুলো নিউরোলজিক্যাল সমস্যা হচ্ছে যেমন হাত-পায়ের মাংসপেশির দুর্বলতা, নার্ভ ভালোভাবে কাজ না করা, নাকে গন্ধ না পাওয়া, হৃদরোগ ছিল না অথচ তাদের হার্ট ভালোভাবে কাজ করছে না। কারো পালসের মধ্যে বিভিন্ন তারতম্য পাওয়া যাচ্ছে। এ ছাড়া যাদের কিডনির অসুখ আছে, কারোনার পর তাদের আরও কিছু সমস্যা যুক্ত হচ্ছে। যাদের লিভারে ইনফেকশন আছে তাদেরও কারও কারও সমস্যা বাড়ছে।’

কেউ করোনার চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে বাড়িতে ফিরলেই তিনি নিশ্চিন্ত নন উল্লেখ করে ডা. আজাদ বলেন, ‘সুস্থ হওয়া ব্যক্তিকে কতগুলো বিষয় দেখতে হবে। যেমন আবার ইনফেকশন হওয়ার ঝুঁকি থাকায় সব সময় চলাফেরা করতে হবে সাবধানে। যারা হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন তাদের যত্ন বেশি নিতে হবে। তাদের চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে থাকতে হবে ৬ মাস। কারও যদি জ্বর বা অন্য সমস্যা দেখা দেয় তাদের যথাযথ পরীক্ষা করে দেখতে হবে কোনো ইনফেকশন আছে কিনা। এখন আমরা করোনা পরবর্তী অসুস্থতায় ভোগা প্রচুর রোগী পাচ্ছি। এসব রোগীদের আরও কেয়ার নেওয়ার প্রয়োজন হয়। এসব বিষয় মাথায় রেখে আমরা ঢামেক হাসপাতালে কোভিড-১৯ পরবর্তী ফলোআপ ক্লিনিক চালু করেছি। এ হাসপাতালের যেসব করোনা রোগী চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি যাবেন এই ক্লিনিক থেকে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হবে। আমরা তাদের কোনো সমস্যা হচ্ছে কিনা তা জানবো, পরীক্ষার প্রয়োজন হলে তা করব। কাউকে আবার হাসপাতালে আনার প্রয়োজন হলে নিয়ে আসব এবং যথাযথ চিকিৎসা দেব।

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘যারা করোনা ভাইরাসের সংক্রমণমুক্ত হয়েছেন তাদের অনেকের অক্সিজেন গ্রহণের মাত্রা আর কমছে না। দেখা যাচ্ছে, করোনা পরীক্ষার ফল নেগেটিভ আবার অন্যসব স্বাস্থ্য পরীক্ষার রিপোর্টও ভালো। কিন্তু তারপরও অনেকেরই মন ভালো হচ্ছে না। কিছুই ভালো লাগছে না, তীব্র অবসাদ ভর করেছে। এটি হচ্ছে পোস্ট কোভিড সিনড্রোম। মূলত যে কোনো ভাইরাসজনিত রোগের পরই শরীর মনে এক ধরনের জড়তা, ক্লান্তি ভর করে। সার্বিকভাবে একে বলে পোস্ট ভাইরাল ফ্যাটিগ। এর লক্ষণগুলোর মধ্যে তীব্র অবসাদ, সারাদিন ঘুম ঘুম ভাব থাকলেও ঘুম না আসা, আবার কখনো ইচ্ছা না থাকলেও অল্প সময়ের জন্য ঘুমিয়ে পড়া অন্যতম। এ ছাড়া একসঙ্গে একাধিক বিষয়ে চিন্তা করতে গেলেই সব এলামেলো লাগা, বেশি বেশি হাই ওঠা, কোনো কিছুতে মনোযোগ দিতে না পারা, কথা বলতে অনাগ্রহ ইত্যাদি সমস্যাও দেখা যাচ্ছে। রোগী আগে যেসব বিষয়ে খুব আনন্দ পেতেন, সেগুলোও করোনা পরবর্তী সময়ে ভালো লাগছে না বা বিরক্ত লাগছে।’

করোনা থেকে সুস্থ হয়ে ওঠা প্রায় ৬০ শতাংশ মানুষের মধ্যে পোস্ট কোভিড সিনড্রোম দেখা যাচ্ছে বলে জানান ডা. হেলাল। তিনি বলেন, ‘এই লক্ষণগুলো তিন চার মাস পর্যন্ত স্থায়ী হতে দেখা যাচ্ছে। এ থেকে পরিত্রাণ পেতে ঘুমের রুটিন ঠিক রাখার চেষ্টা করা এবং রাত জাগা বন্ধ করতে হবে। দিনে সক্রিয় থাকতে হবে, রাতে চেষ্টা করতে হবে ঘুমানোর। পর্যাপ্ত পানি, ফলের রস পান ও পুষ্টিকর খাবার খেতে হবে। চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে প্রতিদিন হালকা ব্যায়াম করতে হবে। কোনো কাজে তাড়াহুড়া করা যাবে না। হাতের কাজগুলো শেষ করতে হবে সময় নিয়ে। প্রতিদিন গোসল করা, পরিষ্কার কাপড় পরার অভ্যাস করা, বন্ধু, স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রাখার চেষ্টা করতে হবে। মানসিক অবসাদ তীব্র হলে পরামর্শ নিতে হবে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের।

নিউজটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর..

© All rights reserved © 2019 WeeklyBangladeshNY.Net
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com