সোমবার, ২১ জুন ২০২১, ১০:৪৬ পূর্বাহ্ন

ফিরছে সোনালি আঁশের সোনালি অতীত

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২০
  • ৫৬ বার

বাংলাদেশের ইতিহাসের সঙ্গে পাট তথা সোনালি আঁশের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আধুনিকতার কবলে পড়তে শুরু করে সেই সোনালি আঁশের ভরা যৌবন। বিশ্বজুড়ে পলিথিন, সিনথেটিক ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় দিন দিন নিস্তেজ হতে থাকে পাটশিল্প। কিন্তু বৈশ্বিক করোনা মহামারীকালে পাটজাত পণ্যের কদর বুঝতে শুরু করে বিশ্ববাসী। চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় রপ্তানি বেড়ে যায় হু হু করে। দেশীয় বাজারের কাঁচা পাটের দাম বেড়েছে কয়েকগুণ। হাসি ফুটেছে চাষিদের মুখে। রপ্তানির ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখতে নীতিসহায়তা পেলে সোনালি আঁশের সোনালি অতীত ফিরে আসবে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।

বালাদেশ রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, রপ্তানি আয়ের ক্ষেত্রে বর্তমানে পোশাক খাতের পরেই দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে পাট খাত। চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের (জুলাই-আগস্ট) এই দুই মাসে পাট ও পাটজাত দ্রব্য রপ্তানি করে বাংলাদেশ আয় করেছে ১৯ কোটি ৫৪ লাখ ডলার, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৫০ শতাংশ বেশি।

চলতি অর্থবছরের জুলাই-আগস্টে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি করে আয় হয়েছে ১৫ কোটি ৪৭ লাখ ডলার। গত বছরের একই সময়ের চেয়ে এ খাতের আয় কমেছে ১৬ দশমিক ৫৪ শতাংশ। অন্যদিকে এই দুই মাসে পাট ও পাটজাত দ্রব্য রপ্তানি করে আয় হয়েছে ১৯ কোটি ৫৪ লাখ ডলার; প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪৯ দশমিক ৬৪ শতাংশ। করোনা ভাইরাসের কারণে গেল অর্থবছরে তৈরি পোশাকসহ বড় সব খাতের রপ্তানি আয়ে ধস নামলেও পাট ও পাটজাত পণ্যের রপ্তানি আয়ে বরাবরই দেখা গেছে উল্টো চিত্র।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বালাদেশ জুট মিলস অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান পাটোয়ারী আমাদের সময়কে বলেন, করোনা ভাইরাসের কারণে পাটের গুরুত্ব বোঝা গেছে। পুরো বিশ্ব এখন পাটের ওপর ঝুঁকছে। পাট পণ্যের ব্যবহার হু হু করে বাড়ছে। রপ্তানিও বাড়ছে। তবে এই ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে সরকারের নীতি সহায়তা প্রয়োজন। আমাদের দেশীয় পাটকলের চাহিদার তুলনায় প্রায় ১০ লাখ বেল উৎপাদন কম হয়েছে। বাজারে পাটের সংকট চলছে। দাম বেড়েছে কয়েকগুণ। এর পরে কাটা দিয়ে পাট পাওয়া যাচ্ছে না। এমন পরিস্থিতিতে কাঁচা পাট রপ্তানি বন্ধ করা ছাড়া আর কোনো পথ নেই। দেশীয় পাটকল বাঁচাতে হলে কাঁচাপাট রপ্তানি বন্ধ করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, পাটশিল্পের ভবিষ্যৎ আমরা ভালো দেখছি। নীতি সহায়তা পেলে এ শিল্প আবারও সোনালি অতীত ফিরে আসবে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) থেকে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে (জুলাই-আগস্ট) বিভিন্ন পণ্য রপ্তানি করে বাংলাদেশ ৬৮৭ কোটি ৮০ লাখ ডলার আয় করেছে। এর মধ্যে ১৯ কোটি ৫৪ লাখ হাজার ডলার এসেছে পাট ও পাট পণ্য রপ্তানি থেকে ।
এই দুই মাসে পাটসুতা (জুট ইয়ার্ন) রপ্তানি হয়েছে ১৪ কোটি ১৬ লাখ ৩০ হাজার ডলারের; প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৬৭ শতাংশ। কাঁচা পাট রপ্তানি হয়েছে ১ কোটি ৯৭ লাখ ৪০ হাজার ডলার; আয় বেড়েছে ৩৭ দশমিক ৯৫ শতাংশ।

পাটের তৈরি বস্তা, চট ও থলে রপ্তানি হয়েছে ২ কোটি ৭ লাখ ৪০ হাজার ডলারের। আয় বেড়েছে ৩৩ দশমিক ৮৯ শতাংশ। পাট ও পাট সুতা দিয়ে হাতে তৈরি বিভিন্ন পণ্য রপ্তানি করে আয় হয়েছে ২ কোটি ২২ লাখ ৩০ হাজার ডলার; প্রবৃদ্ধি হয়েছে ২৩ দশমিক ৭১ শতাংশ। এ ছাড়া পাটের তৈরি অন্যান্য পণ্য রপ্তানি হয়েছে ১ কোটি ৩২ লাখ ৮০ হাজার ডলার।

গত ২০১৯-২০ অর্থবছরে পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানি করে বাংলাদেশ মোট ৮৮ কোটি ২৩ লাখ ৫০ হাজার ডলার আয় করেছিল, যা ২০১৮-১৯ অর্থবছরের চেয়ে ৮ দশমিক ১০ শতাংশ বেশি। লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে আয় বেশি এসেছিল ৭ শতাংশ। গত অর্থবছরে পাটসুতা রপ্তানি থেকে ৫৬ কোটি ৪৬ লাখ ডলার আয় হয়েছিল। অর্থাৎ মোট রপ্তানি ৬৪ শতাংশই এসেছিল পাটসুতা রপ্তানি থেকে। কাঁচাপাট রপ্তানি থেকে আয় হয়েছিল ১৩ কোটি ডলার। পাটের তৈরি বস্তা, চট ও থলে রপ্তানি হয়েছিল ১০ কোটি ৬৫ লাখ ডলারের। ২০২০-২১ অর্থবছরে পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানি থেকে আয়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ১১৬ কোটি ৭০ লাখ (১.১৬ বিলিয়ন) ডলার।

এ দিকে বালাদেশ জুট স্পিনার্স অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান মো. জাহিদ মিয়া বলেন, পাট পণ্যের মূল্য নির্ধারণ হয় কাঁচা পাটের ক্রয় মূলের ওপর। পাট পণ্যের প্রায় ৭৫ শতাশ কাঁচা পাট কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এর মূল্য অতিমাত্রায় বেড়ে গেলে পণ্যের উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাবে। কাঁচা পাট সরবরাহ ঘাটতির কারণে পাটকল বন্ধ হয়ে গেলে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বাজারের ক্রেতারা পাটপণ্য ব্যবহার থেকে সরে দাঁড়াবে। তাই কাঁচা পাট রপ্তানি বন্ধ করতে হবে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে সাড়ে সাত থেকে আট লাখ হেক্টর জমিতে পাট চাষ হয়। যেখানে কম বেশি ৮০ লাখ বেল পাটের আঁশ উৎপন্ন হয়ে থাকে। দেশের সব জেলাতেই কম-বেশি পাটের চাষ হয়। তবে সবচেয়ে বেশি পাটের চাষ হয় ফরিদপুর জেলায়, সেখানে এবার ৮৪ হাজার হেক্টর জমিতে পাটের চাষ হয়েছে। গত মৌসুমে হয়েছিল ৮০ হাজার হেক্টর জমিতে।

জানা গেছে, ব্রিটিশ শাসনামল থেকেই এই অঞ্চলে পাটের চাষ হলেও এখানে প্রথম পাটকল প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৫১ সালের মাঝামাঝিতে নারায়ণগঞ্জে; বেসরকারি পরিচালনায় প্রতিষ্ঠিত এই মিলটির নাম ছিল বাওয়া পাটকল। পরবর্তীতে এই সময়েই একই এলাকায় প্রতিষ্ঠিত হয় এশিয়ার বৃহত্তম পাটকল আদমজী পাটকলের এবং এর পরপরই কয়েক বছরের মধ্যে গড়ে ওঠে অসংখ্য শিল্প কারখানা, ১৯৬০ এ যার সংখ্যা ১৬টি ও ১৯৭১ সালে যা দাঁড়ায় ৭৫টিতে।

বাংলাদেশে পাটশিল্পের সূচনাই ঘটে নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যা নদীর তীরে এবং পরবর্তীতে অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলোও এর আশপাশেই গড়ে ওঠে। ঢাকা, খুলনা ও চট্টগ্রাম – এই তিনটি প্রধান এলাকায় ছড়িয়ে আছে এর প্রতিষ্ঠাগুলো। কিন্তু চলতি বছরের জুলাই মাসে সরকার বিজেএমসির আওতাধীন রাষ্ট্রায়ত্ত ২৬টি পাটকলে উৎপাদন বন্ধ করে ২৪ হাজার ৮৮৬ জন স্থায়ী শ্রমিককে অবসরে পাঠায়।

জানা গেছে, পাটপণ্যের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- নান্দনিক বিভিন্ন ধরনের ব্যাগ, সেমিনার ফাইল এবং প্রমোশনাল পণ্যসমূহ, নানা ধরনের গৃহস্থালি, বাহারি সাজসজ্জায় ব্যবহৃত পণ্যসামগ্রী অন্যতম। দৈনন্দিন জীবনের ব্যবহার পণ্যসামগ্রী যেমন বিভিন্ন প্রকার ব্যাগ (ল্যাপটপ, স্কুল, লেডিস স্পোর্টস, ওয়াটারক্যারি, মোবাইল, পাসপোর্ট, ভ্যানিটি, শপিং, গ্রোসারি, সোল্ডার, ট্রাভেল, সুটকেস, ব্রিফকেস, হ্যান্ড ও মানি ব্যাগ), হোম টেক্সটাইল (বেড কভার, কুশন কভার, সোফা কভার, কম্বল, পর্দা, টেবিল রানার, টেবিল ম্যাট, কার্পেট, ডোর ম্যাট, শতরঞ্জি), পরিধেয় বস্ত্র (ব্লেজার, ফতুয়া, কটি, শাড়ি) ছাড়াও সরকারি ও বেসরকারি সংস্থায় অফিস এক্সেসরিস হিসেবে ফাইল ফোল্ডার, পেনহোল্ডার, কার্ডহোল্ডার, টিস্যুবক্স, টেলিফোন ইনডেক্স, ডায়েরি, প্যাড, ভিজিটিংকার্ড ইত্যাদির চাহিদা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।

নিউজটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর..

© All rights reserved © 2019 WeeklyBangladeshNY.Net
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com