বুধবার, ২৯ জুন ২০২২, ০৬:১১ অপরাহ্ন

কবে সুরক্ষিত হবে ‘ডেডজোন’ টিলাগড়ের এমসি কলেজ?

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ৪ অক্টোবর, ২০২০
  • ৯৫ বার

ঐতিহ্যবাহী এমসি কলেজ, সরকারি কলেজ, ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ ও কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় মিলে সিলেটের টিলাগড় এলাকাটি হওয়ার কথা ছিল শিক্ষা জোন। কিন্তু মাদক, অস্ত্র, সন্ত্রাস আর আধিপত্যের রাজনীতির জেরে একের পর এক প্রাণহানিতে এলাকাটিকে ‘ডেডজোন’ হিসেবে অভিহিত করেন অনেকেই।

স্থানীয় আওয়ামী লীগের দুই নেতা রণজিৎ সরকার ও আজাদুর রহমান আজাদের নেতৃত্বে ছাত্রলীগের রাজনীতি এখানে গ্রুপে-উপগ্রুপে বিভক্ত। উপগ্রুপের মধ্যে আছে মধ্যমসারির নেতাদের একটি গ্রুপ। এ ছাড়া এমসি কলেজ, সরকারি কলেজ, সিলেট কৃষি বিদ্যালয় এবং ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে আছে তাদেরই আরও ৪টি গ্রুপ। এসব গ্রুপের ছাত্রনেতারা মধ্যমসারির নেতাদের দিকনির্দেশনায় নবীন ছাত্রলীগ নেতাদের নিয়ন্ত্রণ করে থাকেন। এসব গ্রুপের আধিপত্য বিস্তার নিয়ে প্রায়ই ঘটে অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা। ঘটে গোলাগুলি, অস্ত্রের মহড়া- এমনকি প্রাণহানি। এসব অস্ত্র কোথা থেকে আসে, কারা জোগানদাতা কোনো কিছুরই অনুসন্ধান করা হয়নি কখনো। একের পর রক্তাক্ত ও প্রাণঘাতী ঘটনায় সিলেটে আতঙ্কের এক জনপদ এখন টিলাগড়। এই টিলাগড়েই ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠ এমসি কলেজ। টিলাগড়কেন্দ্রিক অপ্রীতিকর ঘটনাগুলোর বেশিরভাগই ঘটে এই কলেজে। এতসব ঘটনা সংঘটিত হওয়ার পরও এমসি কলেজ ক্যাম্পাসকে সুরক্ষিত রাখার পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। সচেতনমহলে প্রশ্ন উঠেছে- আর কত অঘটন ঘটলে সুরক্ষিত হবে ঐতিহ্যবাহী এ শিক্ষাঙ্গন।

নানা সূত্রে জানা যায়, উপগ্রুপের নেতাদের ছত্রছায়ায় টিলাগড় এলাকায় নামধারী ছাত্রলীগকর্মীরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। সর্বশেষ কলেজটির হোস্টেলে স্বামীকে আটকে রেখে নববধূকে গণধর্ষণের মতো পৈশাচিক ঘটনা নাড়া দিয়েছে দেশবাসীকে।

এর আগে ২০১২ সালের ৮ জুলাই সন্ধ্যায় ছাত্রশিবির ও ছাত্রলীগের সংঘর্ষের জেরে ঐতিহ্যবাহী এ প্রতিষ্ঠানের ছাত্রাবাসে আগুন দেওয়া হয়। এতে ৪২টি কক্ষ ভস্মীভূত হয়। ঘটনার বিচার বিভাগীয় তদন্তে ২৯ জনকে দায়ী করা হয়। তাদের মধ্যে ১০ ছাত্রলীগ ও ১৯ শিবিরকর্মী।

২০১৬ সালের ৩ অক্টোবর এমসি কলেজ ক্যাম্পাসে খাদিজা আক্তার নার্গিস নামে এক ছাত্রীকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে গুরুতর আহত করেন শাবি ছাত্রলীগের সাবেক নেতা বদরুল আলম। খাদিজা ডিগ্রি পরীক্ষা দিয়ে বেরিয়ে আসার সময় পুকুর পাড়ে হামলার শিকার হন। এ দুই ঘটনায় সে সময় তোলপাড় হয়।

২০১০ সালে টিলাগড়ে গ্রুপিং রাজনীতির বলি হন এমসি কলেজের শিক্ষার্থী ও ছাত্রলীগকর্মী উদয়েন্দু সিংহ পলাশ নামে। ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে ছাত্রলীগকর্মী জাকারিয়া মোহাম্মদ মাসুমকে শিবগঞ্জে ডেকে নিয়ে হত্যা করা হয়। ওই বছর ছাত্রলীগকর্মী ওমর মিয়াদকে গ্রুপিং রাজনীতির কারণে প্রাণ দিতে হয়। একইভাবে ২০১৮ সালের ৭ জানুয়ারি খুন হন ছাত্রলীগকর্মী তানিম খান। চলতি বছর ৬ ফেব্রুয়ারি সরস্বতী পূজার চাঁদার টাকা ভাগাভাগি নিয়ে ছাত্রলীগকর্মী দ্বীপকে টিলাগড় পয়েন্টেই খুন করা হয়।

২০১২ সালের ৮ জুলাই রাতে ছাত্রলীগ-শিবির সংঘর্ষে এমসি কলেজের ছাত্রাবাসের ৪২টি কক্ষ পুড়িয়ে দেওয়া হয়। এ ঘটনায় অভিযুক্ত সবাই টিলাগড়কেন্দ্রিক গ্রুপিং রাজনীতিতে জড়িত ছিলেন। চলতি বছর ১১ মে সিলেট প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরে রঞ্জিত সরকারের নামে ফাও পাঁঠা (খাসি) চেয়ে কর্মী পাঠানোর অভিযোগ ওঠে। পাঁঠা না পেয়ে কতিপয় ছাত্রলীগকর্মী হামলা চালায় বিভাগীয় প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ড. আমিনুল ইসলামের ওপর। আমিনুল এ নিয়ে মামলাও করেন। তিনি বলেন, সেই মামলায় আইন মন্ত্রণালয়ের বিশেষ অনুমতি নিয়ে ভার্চুয়াল কোর্ট থেকে জামিন নেন রঞ্জিত সরকারসহ অন্য আসামিরা।

২০১৩ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর সিপিবির সমাবেশে হামলা চালান টিলাগড় গ্রুপের তৎকালীন জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি হিরণ মাহমুদ। সিপিবির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম আহত হলে বিলুপ্ত করা হয় জেলা ছাত্রলীগের কমিটি। ২০১৭ সালে ওমর মিয়াদ নামে এক ছাত্রলীগকর্মীকে প্রকাশ্যে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় তৎকালীন জেলা ছাত্রলীগের কমিটি বিলুপ্ত করা হয়।

সিলেট মহানগর পুলিশ কমিশনার গোলাম কিবরিয়া আমাদের সময়কে বলেন, ভবিষ্যতে এমসি কলেজে যাতে আর কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে, সে ব্যাপারে আমরা তৎপর থাকব। তবে সে ক্ষেত্রে কলেজ প্রশাসনকে আমাদের যথেষ্ট সহযোগিতা করতে হবে। কারণ পুলিশ চাইলেই কলেজে অভিযান দিতে পারে না। কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে প্রবেশ করতে হয়।

সম্মিলিত নাট্যপরিষদ সিলেটের সভাপতি মিসফাক আহমদ মিশু বলেন, এমসি কলেজ দীর্ঘ দুই যুগ থেকে অরক্ষিত। এই কলেজকে সুরক্ষিত করতে হলে অপকর্মের নেতৃত্বদাতাদের আইনের আওতায় আনার পাশাপাশি মেরুদ-হীন কলেজ প্রশাসনকে নির্ভয়ে কাজ করতে হবে। তিনি আরও বলেন, এসব অপকর্মের বিরুদ্ধে সিলেটের অনেক ব্যক্তিই মুখ খোলেন না ‘ভাই’দের ভয়ে। কলেজে সুরক্ষা ফেরাতে যথাযথ আইন প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি অপরাজনীতি বন্ধ করা এখন সময়ের দাবি।

সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন সভাপতি ফারুক মাহমুদ চৌধুরী বলেন, গডফাদাররাই এমসি কলেজকে সন্ত্রাসের কারখানায় পরিণত করেছে। নিজ প্রয়োজনে কর্মী নামধারী এসব সন্ত্রাসীকে নানা অপরাধে ঠেলে দিচ্ছেন তারা। তাই এসব বন্ধ করতে হলে, দ্রুত পৃষ্ঠপোষককে থামাতে হবে। কলেজে সন্ত্রাস নয়; শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে না আনতে না পারলে যুগযুগ অপকর্মই চলবে। তিনি বলেন, দায়িত্বে অবহেলার কারণে কলেজের অধ্যক্ষসহ যে-বা যারা জড়িত তাদের এবং গডফাদারদের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞেস করার দাবি জানান তিনি।

স্থানীয় কাউন্সিলর ও মহানগর আওয়ামী লীগের শিক্ষা সম্পাদক আজাদুর রহমান আজাদ বলেন, এসসি কলেজ সুরক্ষিত করতে প্রথমত রাজনীতিবিদরা বসে একটি সুন্দর পরিবেশ সৃষ্টির জন্য একটি কাঠামো তৈরি করতে পারেন। দ্বিতীয়ত কলেজের সাবেক শিক্ষার্থী ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের ঐক্যবদ্ধভাবে কলেজের স্বার্থে এগিয়ে আসতে হবে। যাতে ভবিষ্যতে আর নতুন কোনো ঘটনার জন্ম না হয়। এটি এখন সময়ের দাবি। তিনি আরও বলেন, পেছনের সব বাদ দিয়ে কীভাবে সামনের দিনে এসব অপরাধ আর না হয়, তা নিয়ে ভাবতে হবে। কলেজ সুরক্ষিত করতে এবং অপরাধ নির্মূলে কলেজের প্রাক্তন ছাত্র হিসেবে তিনি সবার ঐক্যবদ্ধ কাজে সব ধরনের সহযোগিতা করবেন বলেও প্রতিশ্রুতি দেন।

এ ব্যাপারে জেলা আওয়ামী লীগের যুব ও ক্রীড়া সম্পাদক অ্যাডভোকেট রণজিৎ সরকার বলেন, এমসি কলেজ সুরক্ষিত করতে প্রথমেই অতীতে যেসব ঘটনা ঘটেছে, সেসব ঘটনায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। তিনি বলেন, ক্যাম্পাসে সুস্থ রাজনীতির চর্চা চালু না করলে কলেজকে সুরক্ষা করা অসম্ভব। ধর্ষকদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন তিনি।

এমসি কলেজের অধ্যক্ষ সালেহ আহমদ নিজেকে অসহায় দাবি করে বলেন, তার একার পক্ষে সবকিছু সামাল দেওয়া কষ্টকর।

উল্লেখ্য, সিলেট নগরীর টিলাগড় এলাকার শতবর্ষী বিদ্যাপীঠ এমসি কলেজের যাত্রা শুরু ১৮৯২ সালে। বৃহত্তর সিলেটের প্রথম কলেজ ও দেশের সপ্তম প্রাচীনতম শিক্ষা প্রতিষ্ঠানও এটি।

১৮৯২ সালে রাজা গিরিশচন্দ্র রায় তার পিতামহ মুরারি চাঁদের (এমসি) নামে কলেজটি প্রতিষ্ঠা করেন। ব্রিটিশ আমলে ১৯২০ সালে ৬০০ শতক জায়গার ওপর আসাম ঘরানার স্থাপত্যরীতির সেমিপাকা কাঠামোর ছাত্রাবাস নির্মাণ করা হয়।

নিউজটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published.

এ জাতীয় আরো খবর..

© All rights reserved © 2019 WeeklyBangladeshNY.Net
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com