রবিবার, ০৩ জুলাই ২০২২, ০৩:৪২ অপরাহ্ন

করোনার প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়নে গতি নেই

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৩ নভেম্বর, ২০২০
  • ১১৬ বার

সরকার ঘোষিত সোয়া লাখ কোটি টাকারও বেশি ২১টি প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়ন কাঙ্খিত হারে গতি পাচ্ছে না। বিশেষ করে এই প্যাকেজের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের জন্য দেয়া প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়ন হার খুবই হতাশাব্যঞ্জক।

কোভিড-১৯ কারণে অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের জন্য ঘোষিত এসব প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়ন হার ত্বরান্বিত করতে এবার অংশীদারদের সাথে সংলাপের আয়োজন করতে যাচ্ছে সরকার। এই সংলাপের নামকরণ করা হয়েছে-‘কর্মসংস্থান টিকিয়ে রাখা এবং অর্থনীতির সামগ্রিক চাহিদা ও সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনা।’

সরকারের পক্ষ থেকে অর্থ মন্ত্রণালয়কে এই সংলাপের আয়োজনের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।
আগামী ২৬ নভেম্বর থেকে পর পর দুই সপ্তাহ মোট তিন দিন এই সংলাপ অনুষ্ঠিত হবে। বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে সংলাপটি উদ্বোধন করবেন বলে জানা গেছে।

সংলাপের বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়েছে, কোভিড-১৯ জনিত কারণে লকডাউন এবং কলকারখানা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দা, স্থবিরতা ও কর্মহীনতা দেখা দেয়। বাংলাদেশও এর প্রভাব মুক্ত ছিল না। উদ্ভূত সঙ্কট মোকাবেলা ও ক্ষতিগ্রস্ত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পুনরুজ্জীবিত করে দ্রুত পুনর্গঠন এবং অর্থনীতির গতি আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি তত্ত্বাবধান ও নির্দেশনায় সরকার স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি একটি সামগ্রিক কর্মপন্থা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর আওতায় সামাজিক সুরক্ষা ও অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার সংবলিত মোট এক কোটি ২০ লাখ ১৫৩ কোটি টাকার ২১টি প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছে এবং এর বাস্তবায়ন কাজ বর্তমানে চলমান রয়েছে।

অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে দাবি করা হয়েছে, ‘প্রণোদনা প্যাকেজসমূহ বাস্তবায়নের মাধ্যমে সরকার কর্মসৃজন ও কর্মসুরক্ষার, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, অভ্যন্তরীণ চাহিদা সৃষ্টি এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল রাখায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। ক্ষতিগ্রস্ত শিল্প ও সার্ভিস সেক্টরের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প প্রতিষ্ঠান, লক্ষ্যাভিত্তিক জনগোষ্ঠী, ব্যবসায়ী, কৃষক ও রফতানিমুখী শিল্পে কর্মরত কর্মী এ প্রণোদনা কর্মসূচির মাধ্যমে প্রত্যক্ষভাবে সুবিধাপ্রাপ্ত হচ্ছে। তাই এই প্রণোদনা কর্মসূচির বিভিন্ন দিক ও দেশের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে এর অবদান বিষয়ে সর্বমহলে অধিকতর সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে অর্থ বিভাগ এই সংলাপটির আয়োজন করছে।’

সংলাপের বিষয় জানতে চাইলে অর্থ বিভাগের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত এই প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়ন গতি ত্বরান্বিত করতেই মূলত এই সংলাপটি ডাকা হয়েছে। ২৬ নভেম্বর শুরু হয়ে পরপর আরো দুই সপ্তাহে এক দিন করে মোট তিন দিন এই সংলাপটি অনুষ্ঠিত হবে। প্যাকেজ বাস্তবায়নের সাথে সম্পর্কিত বিভিন্ন অংশীদার ব্যবসায়ী সংগঠন ও নেতৃবৃন্দ এখানে উপস্থিত থাকবেন। আমরা দেখব কোন খাতে কতটুকু প্যাকেজ বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়েছে। কিছু প্যাকেজ বাস্তবায়ন হার খুবই কম, কী কারণে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না তা খতিয়ে দেখা হবে এই সংলাপে।

এ দিকে সরকার ঘোষিত এই প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়নে একটি মিশ্র চিত্র লক্ষ করা গেছে। এখানে বড় শিল্প প্রতিষ্ঠান বা গোষ্ঠীকে ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলো অধিক আগ্রহ থাকলেও ক্ষতিগ্রস্ত ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প প্রতিষ্ঠান তেমন কোনো ঋণ পাচ্ছে না। সম্প্রতি এই প্রণোদনা প্যাকেজের দু’টি বড়খাত বিশ্লেষণ করে এই চিত্র পাওয়া গেছে।

যেমন- এই প্রণোদনার সবচেয়ে বড় দু’টি প্যাকেজ হচ্ছে- ক্ষতিগ্রস্ত শিল্প ও সার্ভিস সেক্টরে প্রণোদনা। এবং অন্যটি হচ্ছে ক্ষতিগ্রস্ত এসএমই খাতে সহায়তা। এই দুই খাতে প্রণোদনা হিসেবে বরাদ্দ রয়েছে মোট ৫৩ হাজার কোটি টাকা। এই দুই প্যাকেজ বাস্তবায়নে ব্যাংকগুলোকে প্রথমটির ক্ষেত্রে ব্যাপক আগ্রহ থাকলেও শেষ প্যাকেজ বাস্তবায়নে তাদের আগ্রহ নেই বললেই চলে। ফলে এখন পর্যন্ত প্রথম প্যাকেজ বাস্তবায়ন অগ্রগতি হার যেখানে ৬৮ শতাংশ। সেখানে অন্য প্যাকেজ বাস্তবায়ন হার হচ্ছে মাত্র ১৬ শতাংশ। এই অবস্থায় অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ থেকে এসএসই খাতে প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোকে জরুরি তাগাদা দিয়েছে বলে জানা গেছে।

এই প্রণোদনায় সবচেয়ে বড় প্যাকেজটি হচ্ছে- করোনার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত শিল্প ও সার্ভিস সেক্টরের প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য স্বল্প সুদে ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল হিসাবে ঋণ সুবিধা প্রদান। এই প্যাকেজ বাস্তবায়নে মোট অর্থ দেয়া হয়েছে ৩৩ হাজার কোটি টাকা। এই প্যাকেজের আওতায় বড় বড় শিল্প প্রতিষ্ঠানকে চলতি মূলধন হিসেবে ঋণ সহায়তা দেয়া হয়েছে।

এ খাতে অগ্রগতি বিষয়ে বলা হয়েছে, গত ২৭ আগস্ট পর্যন্ত আলোচ্য প্রণোদনা প্যাকেজ থেকে ১৭২১ জন ঋণগ্রহীতার অনুকূলে ব্যাংকের মাধ্যমে ২২ হাজার ৫৬১ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল হিসাবে দেয়া হয়েছে ১৭ হাজার ১৫৭ কোটি টাকা। আবার সচল রফতানিমুখী শিল্প প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শ্রমিক-কর্মচারীদের জুন মাসের বেতন-ভাতার হিসাবে আড়াই হাজার কোটি টাকা, জুলাই ২০২০ মাসের বেতন ভাতা হিসেবে আরো দুই হাজার ৯০৪ কোটি টাকা ঋণ হিসেবে বিতরণ করা হয়েছে। এই প্যাকেজের বাস্তবায়ন অগ্রগতি হচ্ছে ৬৮ শতাংশ।

অন্য দিকে ক্ষতিগ্রস্ত ক্ষুদ্র (কুটির শিল্পসহ) ও মাঝারি শিল্প প্রতিষ্ঠানের জন্য স্বল্প সুদে ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল ঋণ সুবিধা দেয়ার জন্য প্রণোদান প্যাকেজে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ২০ হাজার কোটি টাকা। এ খাত থেকে ২৫ আগস্ট পর্যন্ত ৯ হাজার ৫০টি উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে আলোচ্য প্রণোদনা প্যাকেজ হতে ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল হিসেবে তিন হাজার ৫২২ কোটি টাকার ঋণ অনুমোদন করা হয়েছে। আর এই সময়ে প্যাকেজটি বাস্তবায়ন অগ্রগতি মাত্র ১৬ শতাংশ।

একইভাবে পাঁচ হাজার কোটি টাকার কৃষি পুনঃঅর্থায়ন স্কিমের আওতায় ৩১ জুলাই পর্যন্ত ১৭ হাজার ৮০১ জন কৃষক/কৃষি ফার্মের অনুকূলে এই প্রণোদনা প্যাকেজ হতে মাত্র ৪৯৭ কোটি ৪০ লাখ টাকা স্বল্প সুদে ঋণ বিতরণ করা হয়েছে।

সচল রফতানিমুখী শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোতে কর্মরত শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন দেয়ার জন্য প্রণোদনা প্যাকেজ আওতায় যে পাঁচ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছিল তার পুরোটায় গার্মেন্ট খাতের শ্রমিকদের এপ্রিল-মে-জুন মাসের বেতনবাবদ প্রদান করা হয়েছে। এই ঋণের সুদের হার হচ্ছে মাত্র ২ শতাংশ।

একইভাবে নিম্ন আয়ের পেশাজীবী কৃষক/ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য পুনঃঅর্থায়ন স্কিমের আওতায় তিন হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হলেও ১৯ আগস্ট পর্যন্ত ৩৬টি ক্ষুদ্র আর্থিক প্রতিষ্ঠানের (এমএফআই) মাধ্যমে আলোচ্য প্রণোদনা প্যাকেজ থেকে ৯ হাজার ৮৮২ জন কৃষক/ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের মাত্র ২৭৬ কোটি টাকা ঋণ দেয়া হয়েছে।

নিউজটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published.

এ জাতীয় আরো খবর..

© All rights reserved © 2019 WeeklyBangladeshNY.Net
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com