বুধবার, ০৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৩, ১১:১১ অপরাহ্ন

জেলায় জেলায় কোন্দল প্রকাশ্যে বিরোধে আক্রান্ত আওয়ামী লীগ

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২৪ আগস্ট, ২০২১
  • ৮৯ বার

আধিপত্য বিস্তার, সাংসদ ও জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে স্থানীয় নেতাদের দ্বন্দ্ব, ত্যাগী নেতাদের মূল্যায়ন না করে বিতর্কিতদের কমিটিতে স্থান দেওয়াসহ নানা কারণে কোন্দল লেগেই আছে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের তৃণমূলে। এ নিয়ে বাড়ছে বিরোধ, দূরত্ব। এমন ঘটনাও ঘটেছে, এক নেতার ছায়াও দেখতে পারেন না অন্য নেতা। নাম শুনলেই বিষোদগার করেন অন্যের কাছে। দলে স্থান পাওয়া ‘হাইব্রিড’ নেতাদের কারণে ত্যাগী নেতারা কোণঠাসা। এক পক্ষ সভা ডাকলে অন্য পক্ষ তাতে বাধা হয়ে দাঁড়ানোর ঘটনাও প্রায়ই ঘটছে।

রাজনীতির মাঠে ক্ষমতাসীন দলের নেতারাই একে অন্যের প্রতিপক্ষ হয়ে উঠছেন। নগর, মহানগর, জেলা, উপজেলায় সৃষ্ট দলীয় কোন্দল বা বিরোধ মেটাতে কেন্দ্র থেকে বিভিন্ন সময় নির্দেশনা দেওয়া হয়; কিন্তু কেন্দ্রের সেই নির্দেশনা তৃণমূলের প্রভাবশালী নেতারা অনেকক্ষেত্রেই মানেন না। এক জেলার একাধিক নেতা কেন্দ্রীয় নেতাদের উল্টো পরামর্শ ও নির্দেশ দিয়ে আলোচনা-সমালোচনারও জন্ম দিয়েছেন। এসব ঘটনায় ক্ষমতাসীন দলের বিভাগীয় পর্যায়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত কেন্দ্রীয় নেতাদের প্রায়ই বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় দায়িত্বশীল নেতারা বলছেন, একাধিকবার সতর্কবার্তা দিলেও কোনো কোনো এলাকায় তা কর্ণপাত করা হচ্ছে না। ফলে কোথাও কোথাও কেন্দ্রীয় নেতারা অনেকটা নিরুপায়।

জানা গেছে, আওয়ামী লীগের ৭৮টি সাংগঠনিক জেলার কয়েকটি ছাড়া বাকি সবকটাতেই নেতৃত্ব ও নানা স্বার্থ কেন্দ্র করে গ্রুপ-উপগ্রুপের সৃষ্টি হয়েছে। এ নিয়ে কোনো কোনো এলাকায়

কোন্দল দানাবাঁধছে। এ শঙ্কা থেকেই তৃণমূলের সম্মেলনও করতে পারছে না ক্ষমতাসীন দলটি। আওয়ামী লীগের ৭৮টি সাংগঠনিক জেলার মধ্যে প্রায় ৪০টি অনেক আগেই মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে আছে। কোন্দলের জের ধরে অনেক জায়গায় দলের সহযোগী সংগঠনের কমিটি দিতে বারবার কালক্ষেপণ হচ্ছে।

তবে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় একাধিক নেতার ভাষ্য- রাজনৈতিক দলে মতবিরোধ থাকে, কোন্দল থাকে। আওয়ামী লীগের মতো এত বড় একটি দলে মতবিরোধ থাকবে না, কোন্দল থাকবে না, এটা হতে পারে না। এটাকে তারা দলের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র বলে অভিহিত করেছেন। তারা কোনোভাবেই তৃণমূলের চরম কোন্দলের কথা স্বীকার করতে নারাজ।

বরিশাল বিভাগে দায়িত্বপ্রাপ্ত আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দীন নাছিম আমাদের সময়কে বলেন, ‘শোকের মাসের কর্মসূচি পালন করতে গিয়ে দুই-একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটে থাকতে পারে; কিন্তু বড় ধরনের কোনো ঘটনা ঘটেছে বলে আমার নলেজে নেই। আওয়ামী লীগ একটা সুশৃঙ্খল দল। দেশে ও দেশে বাইরে দলটির সাংগঠনিক কার্যক্রমের সুনাম রয়েছে। কেউ কেউ দলের কার্যক্রম নিয়ে অপপ্রচার করতে পারে, বাস্তবে এমন কিছু হয়নি; নজিরও নেই।’

এই বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বিভাগে দায়িত্বপ্রাপ্ত আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও জাতীয় সংসদের হুইপ আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন আমাদের সময়কে বলেন, ‘স্থানীয় পর্যায়ে নানাবিধ কারণে কোন্দল বিরাজমান। পরিপূর্ণ কোন্দলবিহীন দল আশা করা দুরূহ। পৃথিবীর যে প্রান্তেই তিন বাঙালি আছেন, সেখানেই দুই গ্রুপের প্রকাশ্য বা অপ্রকাশ্য অস্তিত্ব বিরাজমান। সেখানে বাঙালির আপন দল আওয়ামী লীগে কোন্দল থাকবে না, তা হয় না। তবে আগস্ট মাসে কোন্দল অব্যাহত রাখা বা বহিঃপ্রকাশ ঘটানো চরম চেতনাবহির্ভূত অরাজনৈতিক আচরণ। যারা এটা করেন তারা আওয়ামী লীগের রাজনীতির মর্মবাণী ও জাতির পিতার অবিনাশী আদর্শ ধারণ করতে ব্যর্থ। তারা দুর্ভাগা। কোন্দল প্রশমনে আমাদের প্রয়াস অব্যাহত রয়েছে।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চট্টগ্রাম বিভাগের একাধিক সাংগঠনিক জেলায় অভ্যন্তরীণ কোন্দল এখন অনেকটাই কেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। সাংগঠনিক দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাদের আমলে নিচ্ছেন না চট্টগ্রাম বিভাগের অধিকাংশ ইউনিটের নেতা। কোন্দল থেমে নেই রাজধানী ঢাকাসহ অন্য সাংগঠনিক জেলাগুলোতেও।

কোন্দলের জের ধরে এক নেতার বিরুদ্ধে অন্য নেতার অভিযোগের স্তূপ জমা পড়েছে দলের কেন্দ্রে। ঢাকা মহানগর ও ঢাকা জেলা, বরিশাল, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, নোয়াখালী, চট্টগ্রাম মহানগর, সিরাজগঞ্জ, নাটোর, টাঙ্গাইল, নারায়ণগঞ্জ, কক্সবাজার, কুমিল্লা, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, বগুড়াসহ বেশ কয়েকটি এলাকা থেকে আসা অভিযোগে উঠে এসেছে ওইসব এলাকার কোন্দলের পুরো চিত্র। ওই ইউনিটগুলোয় সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের মধ্যকার দ্বন্দ্ব চরমে। ফলে তাদের অনুসারীরাও বিভক্ত হয়ে দলীয় কার্যক্রমে যুক্ত হচ্ছেন। এ নিয়ে কর্মীরাও বিব্রত। সারাদেশ থেকে আসা অন্তত চল্লিশটি অভিযোগের মধ্য থেকে ৬টি বড় অভিযোগ এই প্রতিবেদনে যুক্ত করা হয়েছে।

বরিশাল মহানগরের রাজনীতিতে দ্বিধাবিভক্তি থাকলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোয় এর আগে নেতায়-নেতায় বিরোধ দৃশ্যমান হয়নি। গত ১৮ আগস্ট রাতে বরিশাল মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহর প্রতিনিধিরা বরিশাল সদর (বরিশাল-৫) আসনের সংসদ সদস্য ও পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী কর্নেল (অব) জাহিদ ফারুকের শোকের মাসের শ্রদ্ধার্ঘ্য পোস্টার অপসারণ করতে যায়। এ নিয়ে উভয় পক্ষের অপ্রীতিকর ঘটনার সূত্রপাত হয়।

সূত্র জানায়, ঘটনাটি সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা মুনিবুর রহমানের সরকারি বাসভবনের পাশে হওয়ায় পোস্টার অপসারণে বাধা দেন তার নিরাপত্তাকর্মীরা। এর পর ঘটনার ঘনঘটায় দলীয় কোন্দলকে ছাড়িয়ে মহানগর আওয়ামী লীগ বনাম বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন পর্যন্ত গড়ায়। পক্ষে-বিপক্ষে হামলা, মামলা শেষে গত ২২ আগস্ট রাতে সমঝোতায় পৌঁছে সব পক্ষ। তবে বরিশাল বিভাগের অন্যান্য এলাকার রাজনীতিতে দ্বিধাবিভক্ত অবস্থা এখনো বিরাজমান বলে দলীয় সূত্রেই জানা গেছে।

জানা গেছে, দেড় বছর ধরে নোয়াখালীতে দলীয় কোন্দল লেগেই আছে। এ নিয়ে একাধিকবার সংঘর্ষ, হামলা, মামলা এবং হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। যা শোকের মাসেও অব্যাহত রয়েছে। নোয়াখালী জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সদর আসনের সংসদ সদস্য একরামুল করিম চৌধুরী এমপির সঙ্গে বসুরহাট পৌরসভার মেয়র আবদুল কাদের মির্জার দ্বন্দ্ব অব্যাহত। প্রায়ই তারা একজন আরেকজনের বিপক্ষে কথা বলছেন। আবদুল কাদের মির্জা কথা বলার সময় নিজের পরিবারের লোকদের কড়া সমালোচনা করছেন। এ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা রয়েছে দলের ভেতরে-বাইরে। গত ২৯ জুলাই চিকিৎসার জন্য দেশ ছেড়েছেন আবদুল কাদের মির্জা। তবু নোয়াখালীর রাজনীতির মাঠ শান্ত হয়নি।

৩ আগস্ট ওবায়দুল কাদেরের বসুরহাটের বাড়ির সামনে গুলি ও বোমা বিস্ফোরণ হয়। পরিবার থেকে অনুমান করে বলা হয়েছিল- বসুরহাটের মেয়র আবদুল কাদের মির্জার প্রতিপক্ষ এমন ঘটনা ঘটাতে পারে। অন্যদিকে ৫ আগস্ট শহীদ শেখ কামালের জন্মদিনের অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই দল থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দেন একরামুল করিম চৌধুরী এমপি। তিন ঘণ্টার মধ্যে তিনি এ সিদ্ধান্ত থেকে সরেও আসেন। এর পর পুনরায় দলীয় কার্যক্রমে যুক্ত হন। তবে দলের শীর্ষ পর্যায় থেকে উভয়কে সতর্ক করে দিলেও এখনো যে যার মতো অবস্থানেই আছেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।

১৫ আগস্ট শোক দিবসের শ্রদ্ধার্ঘ্য অনুষ্ঠানে দলীয় কার্যালয়ে তালা, কোন্দলের জের ধরে চলে বিক্ষোভ, অতঃপর তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে বেশকিছু জায়গায় শোক দিবসের কর্মসূচি পালন করা হয়।

গত ২১ আগস্ট বিকালে গ্রেনেড হামলা দিবসের আলোচনাসভায় নোয়াখালী জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অধ্যক্ষ খায়রুল আনম সেলিম দলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরকে উদ্দেশ করে বক্তব্য দেন। সেলিম তার বক্তব্যে ওবায়দুল কাদেরকে অনুরোধ করে বলেন, বিএনপির দোষারোপ করা বাদ দিয়ে নিজের শহরটাকে ঠিক করেন। কীভাবে কোন্দল থেকে নোয়াখালী রেহাই পাবে, সেই বিষয়ে নির্দেশনা দিয়ে তৃণমূলের এই নেতা বক্তব্য দেন। এর আগে ওবায়দুল কাদেরের ভাই আবদুল কাদের মির্জা দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের সমালোচনা করে বক্তব্য দেন।

জানা গেছে, রাজধানীর অদূরে নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিও বহুদিন ধরে দ্বিধাবিভক্ত। নারায়নগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী নানা ইস্যুতে দ্বন্দ্বে জড়ানোর খবর প্রতিনিয়ত পাওয়া যায়। গত ১০ আগস্ট পুনরায় আইভীর বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে। ওইদিন দুপুরে নগরীর মাসদাইর এলাকায় কেন্দ্রীয় সিটি কবরস্থান পরিদর্শন করেন শামীম ওসমান। এ সময় তিনি বলেন, গত ২৭ জুলাই সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীর মায়ের কবর জিয়ারতের সময়ও স্বাভাবিক অবস্থা ছিল। সিটি করপোরেশনের নিয়োগকৃত ঠিকাদার কবরস্থানের পাশে শ্মশানের পুকুর খননসহ সংস্কারকাজ করতে গিয়ে কিছু জায়গায় প্রায় ৩ ফুট মাটি ফেলে ভরাট করায় অর্ধশতাধিক কবর মাটির নিচে পড়ে গেছে। কয়েক বীর মুক্তিযোদ্ধার কবরের সাইনবোর্ড ভেঙে ফেলা হয়েছে। এটিকে তিনি আইভীর ব্যক্তিগত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ বলে মন্তব্য করেন।

গণমাধ্যমে নাটোর-২ সদর আসনের সংসদ সদস্য মো. শফিকুল ইসলাম শিমুলের সঙ্গে নাটোর জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রবীণ সংসদ সদস্য ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক আবদুল কুদ্দুসের দ্বন্দ্বের খবর উঠে এসেছে। এই দুজনের অনুসারীরা দুই ধারায় ভাগ হয়ে রাজনীতি করছেন। শিমুল এমপি অস্ত্রের মুখে শুধু দলীয় কার্যালয় থেকেই নয়, আবদুল কুদ্দুসকে নাটোর শহর থেকেও বিতাড়িত করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

নাটোরের স্থানীয় নেতারা বলছেন, নাটোরের রাজনীতিতে প্রতিনিয়তই ভীতিকর অবস্থা বিরাজ করে। এর মূল কারণ এমপি শিমুল। শোকের মাসেও এই অবস্থার উত্তরণ ঘটেনি। আগস্ট মাসের প্রথম দিন এক বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষককে প্রাণনাশের হুমকি দিয়েছেন- এমন অভিযোগও আছে শিমুলের বিরুদ্ধে। শোকাবহ আগস্ট মাসে দলীয় কর্মসূচিও পালন করেছেন বলা যায় একচ্ছত্রভাবে।

১৫ আগস্ট কুমিল্লার বড়ুরায় দুই গ্রুপে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে। রাজনৈতিক কোন্দলের জের ধরে ১৮ আগস্ট যশোরের কেশবপুরে ছাত্রলীগ নেতাকে গলা কেটে হত্যা করা হয়।

নিউজটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর..

© All rights reserved © 2019 WeeklyBangladeshNY.Net
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com