মঙ্গলবার, ২৪ মে ২০২২, ০৫:০০ পূর্বাহ্ন

জাপানিদের দীর্ঘ জীবনের রহস্য

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ৩১ জানুয়ারী, ২০২২
  • ৩৩ বার

সেঞ্চুরি পার করাটা জাপানিদের মধ্যে তেমন কোনো বড় ব্যাপার নয়। কিন্তু কেন? প্রথম সূর্যোদয়ের এই দেশে কী রহস্য লুকানো রয়েছে? আসলে কোনো ম্যাজিকও নয়। স্রেফ লাইফস্টাইলেই বাজিমাৎ করেছেন জাপানিরা। জীবনযাত্রায় কোন জিনিসগুলো মেনে চললে জাপানিদের মতো দীর্ঘ আয়ু পেতে পারেন আপনিও। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানিয়েছেন-শামস্ বিশ্বাস

খাদ্যাভ্যাস আর জীবনধারার ফল

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানে নিহত হয় ২ দশমিক ৫ মিলিয়ন থেকে ৩ দশমিক ১ মিলিয়ন মানুষ। এত বড় একটি বিপর্যয়ের পরও জাপানের মানুষ তাদের কঠিন অধ্যবসায় ও সঠিক নিয়মচর্চার মাধ্যমে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। সময়ের পরিক্রমায় এ দেশটি বর্তমানে সবচেয়ে বেশি গড় আয়ুসম্পন্ন দেশ হিসেবে প্রথম স্থানটি দখল করে নিয়েছে। বেশ লম্বা সময় ধরেই প্রথম স্থানটি এ দেশটির দখলে রয়েছে। জাপানের প্রায় ২০ লাখ মানুষের বয়স ৯০ বছরের ওপরে। তাদের মধ্যে প্রায় ৭০ হাজারের বয়স ১০০ বছরেরও বেশি। জাপানের গড় আয়ু ৮৪ দশমিক ২ বছর। পুরুষরা গড়ে ৮১ দশমিক ১ বছর বাঁচেন। নারীদের গড় আয়ু বেশি- ৮৭ দশমিক ১ বছর। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী জাপানের মানুষ ৭৫ বছর পর্যন্ত কোনো ধরনের দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত হওয়া ছাড়াই বেঁচে থাকে। জাপানিদের এই দীর্ঘ আয়ু তাদের জেনেটিক গঠনের ফল নয়, বরং এটি খাদ্যাভ্যাস আর জীবনধারার ফল।

আরও পড়ুন- জুতায় দুর্গন্ধের কারণ ও দূর করার উপায়

সামুদ্রিক খাবার

এখানে সামুদ্রিক খাবার খুবই প্রিয় ও মাংসের চাহিদা বেশ কম। প্রকৃতপক্ষে জাপান পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি মাছ খাওয়া জাতিদের একটি। মাছে কোলেস্টেরল ও ক্ষতিকারক চর্বির পরিমাণ খুবই কম। ফলে জাপানে হৃদরোগের ঝুঁকি ৩৬ শতাংশ কম। জাপানিরা প্রচুর সয়া ও সমুদ্র শৈবাল খান। এক কাপ সমুদ্র শৈবালে ২ থেকে ৯ গ্রাম প্রোটিন থাকে। এটিতে প্রাকৃতিক আয়োডিন থাকে। তা থাইরয়েডের জন্য অত্যন্ত উপকারী।

চা পানের সংস্কৃতি

জাপানে দীর্ঘ জীবনের আরেকটি কারণ অধিক পরিমাণ চা গ্রহণ। জাপানে বহু প্রজাতির চা পানের সংস্কৃতি বহু পুরনো। অন্যান্য দেশে যেখানে কফি পানকে আভিজাত্য হিসেবে দেখা হয়, সেখানে জাপানে চা পানের সংস্কৃতিকে গড়ে তোলা হয় অভিজাত্যের সঙ্গে। কফিতেও রয়েছে বহু স্বাস্থ্য উপকারিতা। তবে জাপানে উৎপাদিত বিভিন্ন প্রজাতির চা তথা মাচা চা থেকে পাওয়া যাবে বেশি উপকারিতা। চায়ে অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের পরিমাণ কফির চেয়ে অনেক। চা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে, প্রতিরোধ করে ক্যানসার, ধ্বংস করে কোলেস্টেরল।

ফ্রেশ খাবার

আমরা দৈনিক যে খাবারগুলো খাই, এর কতটা ফ্রেশ হয় ভাবুন তো একবার! এদিক থেকে জাপানের মানুষ খুব কড়া নিয়ম মেনে চলে। তাদের প্রতিটি খাবার একদম ফ্রেশ উপাদানে তৈরি হওয়া চায়। এমনকি বাজারজাত খাবার তৈরি হওয়ার ঘণ্টাখানেকের মধ্যে তারা তা খেয়ে ফেলেন। এ ক্ষেত্রে চাহিদা অনুযায়ী খাবার তৈরি করা হয়। ফলে বাড়তি খাবার থাকে না। স্বাভাবিকভাবেই ফ্রেশ খাবার শরীরে বাড়তি শক্তি জোগাতে কাজ করে।

তুলনামূলক ছোট পাত্র

খাবারের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখা জাপানি সংস্কৃতির অনেক বড় একটি অংশ। তারা ছোট পাত্রে চপস্টিক ব্যবহারের মাধ্যমে খাবার খান এবং পাত্রে খাবারও নেন পরিমাণে কম। এ ছাড়া জাপানিরা একদম পেটভরে খাবার না খেয়ে পেটের কিছু অংশ খালি রেখে দেন। এতে খাবার পরিপূর্ণভাবে হজম হয়।

বেশি শারীরিক কার্যক্রম

জাপানিরা কর্মময় জীবন পার করেন। বেশিরভাগ জাপানি নিকটতম বাসস্টেশনে হেঁটে যান। এর পর ট্রেনে উঠে দাঁড়িয়ে ভ্রমণ করেন এবং ট্রেন থেকে নেমে হেঁটে গন্তব্যে যান। তারা প্রায়ই অফিসে যান হেঁটে বা সাইকেলে। প্রতিদিন সকালে এই নিয়ম মেনে চলার ফলে সকালের শরীরচর্চার অনেকখানি পূরণ হয় এবং প্রয়োজনীয় কর্মশক্তি পাওয়া যায়। এতে শরীর ও মন চাঙা হয়ে ওঠে। তাই কর্মশক্তি ফিরে পাওয়া যায়। বয়স্করাও যতদিন সম্ভব শারীরিক পরিশ্রম অব্যাহত রাখেন।

ঘুমানোর আগে গোসল

প্রায় ৮৫ শতাংশ জাপানি ঘুমানোর আগে গোসল করেন। গোসলে গরম পানির ব্যবহার ঘামের দূষণ থেকে রক্ষা করে। পানির উষ্ণতা শরীরের প্রদাহ ও মানসিক চাপ কমায়। গরম পানি রক্ত সঞ্চালন ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে।

নিয়মিত ডাক্তারের চেকআপ

জাপানের চিকিৎসাব্যবস্থা পৃথিবীর সবচেয়ে কার্যকর। রাষ্ট্র চিকিৎসার ক্ষেত্রে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত ব্যয় বহন করে। জাপানের নাগরিকরা নিয়মিত ডাক্তারের কাছে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করান। এ নিয়মে কোনো হেরফের হয় না। ফলে সামান্যতম স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দিলেও তা দ্রুত সমাধান করে ফেলা হয়। এতে বড় ধরনের কোনো স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয় না।

জীবনের লক্ষ্য

বিজ্ঞানীদের মতে- সুন্দর এ পৃথিবীতে মানুষ যদি তার লক্ষ্য ঠিক করতে পারে, তা হলে তিনি আরও কয়েক বছর বেশি বাঁচবেন। সম্প্রতি এক গবেষণায় জানা গেছে, উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যহীন মানুষের তুলনায় জীবনে লক্ষ্য-উদ্দেশ্য রয়েছে- এমন মানুষ দীর্ঘায়ু হয়। গবেষক দলের প্রধান কানাডার কার্লেটন ইউনিভার্সিটির ডক্টর প্যাট্রিক হিল বলেন, জীবনে নির্দেশনা খুঁজে পাওয়া ও আকর্ষণীয় উদ্দেশ্য নির্ধারণ করার মাধ্যমে প্রকৃত অর্থেই দীর্ঘদিন বেঁচে থাকা সম্ভব। গবেষকরা জানান, তাদের গবেষণার ফল অনুসারে জীবনের লক্ষ্য নির্ধারণের মাধ্যমে প্রবীণ বয়সেও সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হওয়া সম্ভব। যে কোনো বয়সেই লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য নির্ধারণ করে জীবন আয়ুতে যোগ করে নেওয়া সম্ভব আরও কয়েকটি বছর। তবে জীবনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের সঙ্গে দীর্ঘায়ুর ব্যাপারটি ঠিক কী কারণে জড়িত, এ বিষয় সম্পর্কে কিছু জানাতে পারেননি গবেষকরা।

ব্যতিক্রম রান্নার ধরন

জাপানের মানুষ প্রায় ঘরোয়া খাবার খায়। ফলে জাপানে স্থূলতার হার মাত্র ৩ দশমিক ৬ শতাংশ। তা পৃথিবীতে সর্বনিম্ন। সাধারণত জাপানিদের খাবার তৈরির প্রক্রিয়ার মধ্যে থাকে স্টিমিং (ভাপে রান্না), ফার্মেন্টিং (গাঁজন), স্লো কুকিং, প্যান গ্রিলিং ও স্টির ফ্রাইং। রান্নার এই ধরনগুলোয় প্রাকৃতিক খাদ্য উপাদানের পুষ্টিগুণ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অক্ষুণœ থাকে। ফলে যে খাবার খাওয়া হয়, তা থেকে প্রায় সবটুকুই উপকারিতা শরীর পায়।

বয়স্কদের মানসিকভাবে উজ্জীবিত করা

জাপানিদের দীর্ঘ জীবন বেঁচে থাকতে সহায়তা করে বৃদ্ধদের মানসিক চাপ কম থাকা। দেখা গেছে, জাপানি বুড়া-বুড়িরা তাদের সন্তানদের কল্যাণে বৃদ্ধ বয়সে মানসিক শান্তিতে থাকেন। তাদের সাধারণত আয়-ব্যয়, বিভিন্ন বিল ইত্যাদি নিয়ে চিন্তা করতে হয় না। জাপানিরা ঐতিহ্যগতভাবেই বয়স্কদের যথেষ্ট যত্ন নেন। আর বয়স্করাও নাতি-নাতনিদের সঙ্গে সময় কাটাতে অভ্যস্ত। জাপানে বয়স্ক ব্যক্তিদের জীবন্ত সম্পদ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। সামাজিকভাবে দেওয়া হয় সর্বোচ্চ সম্মান। তা বয়স্কদের রাখে মানসিকভাবে উজ্জীবিত।

খাবারে পর্যাপ্ত সবজি

অন্যান্য যে কোনো দেশের মতো বিভিন্ন ধরনের খাবার নয়- জাপানের খাদ্য তালিকায় বড় একটি অংশজুড়েই থাকে তাজা শাকসবজি, মৌসুমি ফলমূল, ফার্মেন্টেড সয়া ও ভাত। তা থেকে পর্যাপ্ত ফাইটোকেমিক্যালস, ভিটামিন ও মিনারেল পাওয়া যায়। স্বাস্থ্যকর ও পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ খাবার খাওয়ার এ নিয়ম খুব সহজেই দীর্ঘায়ু পেতে অবদান রাখে।

নিউজটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published.

এ জাতীয় আরো খবর..

© All rights reserved © 2019 WeeklyBangladeshNY.Net
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com