রবিবার, ২২ মে ২০২২, ০৩:১৮ পূর্বাহ্ন

নতুন ইসির সন্ধান শুরু

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ৬ ফেব্রুয়ারী, ২০২২
  • ৩৪ বার

নতুন নির্বাচন কমিশন (ইসি) গঠনে সার্চ কমিটি গঠন করা হয়েছে। গতকাল শনিবার প্রথমবারের মতো আইনের আলোকে বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের নেতৃত্বে ৬ সদস্যের সার্চ কমিটি গঠন করেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ।

নতুন প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশনারের খোঁজে আজ রবিবার বিকেল সাড়ে ৪ টায় সুপ্রিম কোর্টের জাজেস লাউঞ্জে সার্চ কমিটির প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। যোগ্য ব্যক্তি বাছাইয়ে এ কমিটির দেওয়া তালিকা থেকেই ইসি গঠন করবেন রাষ্ট্রপতি। নতুন গঠিত সার্চ কমিটি নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে নানা মত থাকলেও সবাই চায় নিরপেক্ষ ও যোগ্য ব্যক্তি বাছাইয়ে তারা ভূমিকা রাখবেন।

আপিল বিভাগের বিচারপতি ও কমিটির সভাপতি বিচারপতি ওবায়দুল হাসান বলেছেন, এটা কমিটির জন্য চ্যালেঞ্জ। তারা রাষ্ট্রপতির কাছে যোগ্য লোকের তালিকাই দেবেন।

সার্চ কমিটির বিষয়ে আওয়ামী লীগ বলেছে, এ কমিটি অত্যন্ত নিরপেক্ষ। তবে বিএনপি বলছে, কমিটি ঠিকঠাক হয়নি। যোগ্য লোককে কমিটিতে রাখা হয়নি।

সার্চ কমিটির সভাপতি বিচারপতি ওবায়দুল হাসান গণমাধ্যমকে বলেন, ‘মহামান্য রাষ্ট্রপতি আমার এবং সার্চ কমিটির সদস্যদের ওপর যে আস্থা রেখেছেন, সে জন্য ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। সংবিধান ও আইন অনুসারে দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করব। কমিটির বাকি সদস্যদের নিয়ে শিগগিরই বৈঠকে বসব। চেষ্টা করব কালকের (রবিবার) মধ্যে বসে কমিটির সভা করতে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা সবাই বসে, টার্মস অব রেফারেন্স ঠিক করে আইন অনুযায়ী কাজ শুরু করব।’ নির্ধারিত সময়ে কমিটি কাজ শেষ করবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

অপর এক প্রশ্নের জবাবে বিচারপতি ওবায়দুল হাসান বলেন, ‘একাধিক বৈঠক তো বটেই। কয়টা বৈঠক হবে না হবে, বলা যাবে না। আমি তো এখনো বসিনি। তবে সময়ের মধ্যেই হবে।’

জানা গেছে, আগের মতো এবারও সুপ্রিমকোর্টের জাজেস লাউঞ্জে সার্চ কমিটির বৈঠক হতে পারে। কমিটিকে সাচিবিক সহায়তা দেবে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ।

স্বাধীনতার পর এবারই প্রথম আইন অনুযায়ী ইসি গঠিত হচ্ছে। গত ২৭ জানুয়ারি প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ বিল-২০২২ জাতীয় সংসদে পাস হয়। এর পর রাষ্ট্রপতির সম্মতির পর ২৯ জানুয়ারি বিলটি গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়।

গত ৩ ফেব্রুয়ারি সার্চ কমিটির অনুমোদন দিয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠায় বঙ্গভবন। গতকাল শনিবার এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। আপিল বিভাগের বিচারপতি ওবায়দুল হাসানকে প্রধান করে (সভাপতি) গঠন করা সার্চ কমিটির বাকি ৫ সদস্য হলেন- প্রধান বিচারপতি মনোনীত হাইকোর্টের বিচারপতি এসএম কুদ্দুস জামান, মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক (পদাধিকার বলে), সরকারি কর্ম কমিশনের চেয়ারম্যান (পদাধিকার বলে) এবং রাষ্ট্রপতি মনোনীত দুজন বিশিষ্ট নাগরিক- সাবেক নির্বাচন কমিশনার মুহাম্মদ ছহুল হোসাইন ও কথাসাহিত্যিক অধ্যাপক আনোয়ারা সৈয়দ হক।

এদিকে সাবেক নির্বাচন কমিশনার ছহুল হোসাইন বিগত সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চাওয়ায় তার নিরপেক্ষতা নিয়ে অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এম হাফিজ উদ্দিন খান আমাদের সময়কে বলেন, ‘সার্চ কমিটির চারজন তো পদাধিকার বলে নিয়োগ পেয়েছেন। তাদের সম্পর্কে বলার কিছু নেই। এ ছাড়া রাষ্ট্রপতি নিয়োগকৃত দুজনই আওয়ামী লীগপন্থি।’ সাবেক নির্বাচন কমিশনার ছহুল হোসাইন সম্পর্কে তিনি বলেন, তিনি যেহেতু মনোনয়ন চেয়েছিলেন, সে ক্ষেত্রে তাকে নিয়োগ দেওয়া ঠিক হয়নি।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, কমিটির সদস্যদের প্রতি শ্রদ্ধাভরে আমরা আবেদন করছি যে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্য কমিশনার পদে নিয়োগের জন্য তালিকা প্রণয়নের ক্ষেত্রে তারা যেন এমন ব্যক্তিদের নাম বিবেচনায় নেন, যারা তাদের ব্যক্তি ও পেশাগত জীবনে সততা, দলনিরপেক্ষতা, ন্যায়পরায়ণতা, বস্তুনিষ্ঠতা, সৎ সাহস ও গ্রহণযোগ্যতার জন্য সুপরিচিত। একই সঙ্গে মনোনীত ব্যক্তিদের যেন কোনোভাবেই নৈতিক স্খলন, দুর্নীতি ও ঋণখেলাপের মতো অপরাধের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা না থাকে, তা নিশ্চিত করা অপরিহার্য।

স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ড. তোফায়েল আহমেদ বলেন, ‘সার্চ কমিটিতে যে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, আমরা আশা করব তারা ভালোভাবে দায়িত্ব পালন করবেন। তিনি আরও বলেন, ‘কমিশন তো একটা হবে, এটা তো খালি থাকবে না। সুতরাং যতটুকু ভালো হয় সেটাই ভালো।’

বিতর্ক প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সাবেক নির্বাচন কমিশনার ছহুল হোসাইন বলেন, ‘আমার সারাজীবনের আদর্শ কি নষ্ট হয়ে গেছে? আওয়ামী লীগ থেকে যদি এমপি হতাম, মন্ত্রী হতাম, তা হলে কি আদর্শ থেকে বিচ্যুত হতাম? কখনই না। আমি আমার আদর্শে আছি; ন্যায়নীতির আদর্শে আছি। কোনো অবস্থাতেই এ আদর্শ থেকে বিচ্যুত হব না।’

এদিকে সার্চ কমিটির কাজ সম্পর্কে আইনে বলা হয়েছে, এ কমিটি স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতার নীতি অনুসরণ করে দায়িত্ব পালন করবে। আইনে বেঁধে দেওয়া যোগ্যতা, অযোগ্যতা, অভিজ্ঞতা, দক্ষতা ও সুনাম বিবেচনা করে সিইসি ও নির্বাচন কমিশনার পদে নিয়োগের জন্য রাষ্ট্রপতির কাছে সুপারিশ করা হবে।

অনুসন্ধান কমিটি প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) ও কমিশনারদের প্রতি পদের জন্য ২ জন করে ১০ জনের নাম প্রস্তাব করবে। এ ১০ জনের মধ্য থেকে সিইসিসহ পাঁচজনকে দিয়ে ইসি গঠন করবেন রাষ্ট্রপতি।

নতুন আইন অনুযায়ী, সার্চ কমিটি গঠনের ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে রাষ্ট্রপতির কাছে যোগ্য ব্যক্তিদের নাম প্রস্তাব করতে হবে অনুসন্ধান কমিটিকে। তবে আগামী ১৪ ফেব্রুয়ারি কেএম নূরুল হুদা নেতৃত্বাধীন ইসি বিদায় নেবে বলে তার আগেই নাম সুপারিশের জন্য সার্চ কমিটির হাতে সময় আছে ৯ দিন।

সূত্র জানিয়েছে, চলতি সপ্তাহের মধ্যে সার্চ কমিটি রাষ্ট্রপতির কাছে ১০ জনের তালিকা জমা দিতে পারেন। এ প্রসঙ্গে সার্চ কমিটির সদস্য ও সাবেক নির্বাচন কমিশনার মুহাম্মদ ছহুল হোসাইন বলেন, ‘মনে হয় ১৫ দিন আমরা পাচ্ছি না। কারণ ১৪ তারিখ (ফেব্রুয়ারি) বর্তমান কমিশনের দায়িত্বভার শেষ হয়ে যাবে। তা হলে ১৫ তারিখ থেকে নতুন কমিশনকে দায়িত্ব নিতে হয়। দেখা যাক, কী করা যায়।’

আইন অনুসারে, সার্চ কমিটি সিইসি এবং নির্বাচন কমিশনার পদে যোগ্যদের অনুসন্ধানের জন্য রাজনৈতিক দল এবং পেশাজীবী সংগঠনের কাছ থেকে নাম আহ্বান করতে পারবে।

সার্চ কমিটিতে যারা

বিচারপতি ওবায়দুল হাসান

দেশের সর্বোচ্চ আদালত আপিল বিভাগে দুবছর ধরে বিচারকের দায়িত্ব পালন করছেন বিচারপতি ওবায়দুল হাসান। ইসি গঠনের সার্চ কমিটিতে এর আগেও দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা রয়েছে এই বিচারকের। ২০১৭ সালের সার্চ কমিটিতে হাইকোর্ট বিভাগের বিচারক হিসেবে সদস্য ছিলেন তিনি। ওবায়দুল হাসান ২০১২ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারকের দায়িত্ব নিয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সাবেক জ্যেষ্ঠ সচিব ও বর্তমানে বাংলাদেশ বিমান এয়ারলাইন্সের চেয়ারম্যান সাজ্জাদুল হাসান বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের ছোট ভাই।

বিচারপতি এসএম কুদ্দুস জামান

৬১ বছর বয়সী এসএম কুদ্দুস জামান চার বছর ধরে হাইকোর্ট বিভাগে বিচারকের দায়িত্ব পালন করছেন। রাজবাড়ীতে জন্ম নেওয়া কুদ্দুস জামান ১৯৮৪ সালে জুডিশিয়াল সার্ভিসে যোগ দেন। ২০০৬ সালে জেলা জজ হন। সুপ্রিমকোর্টে রেজিস্ট্রারের দায়িত্বও পালন করেন তিনি। ২০১৮ সালে হাই কোর্টে বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পান।

মুহাম্মদ ছহুল হোসাইন

মুহাম্মদ ছহুল হোসাইন ২০০৭-২০১২ সালে নির্বাচন কমিশনারেরর দায়িত্ব পালন করেন। জরুরি অবস্থার সময় দায়িত্ব নেওয়া সেই কমিশনই সিইসি ও নির্বাচন কমিশনার নিয়োগে আইন করার প্রথম খসড়া প্রস্তাব উপস্থাপন করেছিলেন। সিলেটের সন্তান ছহুল হোসাইন জেলা জজ হিসেবে দেশের বিভিন্ন জেলায় দায়িত্ব পালন করেন। পরে আইন সচিবও হয়েছিলেন তিনি। অবসর নেওয়ার পর তিনি নির্বাচন কমিশনারের দায়িত্ব পেয়েছিলেন। একাদশ সংসদ সংসদের সময় তার নামে সিলেট-১ আসন থেকে মনোনয়নপত্র সংগ্রহও করেছিলেন সমর্থকরা।

আনোয়ারা সৈয়দ হক

আনোয়ারা সৈয়দ হক মনোরোগ বিশেষজ্ঞ হিসেবে পরিচিত। লেখক হিসেবেও রয়েছে তার পরিচিতি। তার স্বামী প্রয়াত সাহিত্যিক সৈয়দ শামসুল হকের খ্যাতি ছিল সব্যসাচী লেখক হিসেবে। তিনি কিছুকাল বিমানবাহিনীতে চিকিৎসক হিসেবে ছিলেন। গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ ও শিশুসাহিত্য রচনা করে যাওয়া আনোয়ারা সৈয়দ হক ২০১০ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার পান। ২০১৯ সালে তাকে একুশে পদকে ভূষিত করে সরকার।

সোহরাব হোসাইন

৬১ বছর বয়সী সোহরাব হোসাইন সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) চেয়ারম্যানের দায়িত্বে আছে ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর থেকে। ১৯৮৪ ব্যাচের প্রশাসন ক্যাডারের এ কর্মকর্তা সবশেষ মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের জ্যেষ্ঠ সচিব ছিলেন। অবসরোত্তর ছুটিতে যান ২০১৯ সালের ৩১ ডিসেম্বরে। নোয়াখালীর সন্তান সোহরাব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী।

মুসলিম চৌধুরী

মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী ২০১৮ সালের ১৫ জুলাই থেকে মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের দায়িত্বে রয়েছেন। তার আগে অর্থ সচিব পদে ছিলেন তিনি। চট্টগ্রামে জন্ম নেওয়া মুসলিম চৌধুরী চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে হিসাববিজ্ঞানে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেওয়ার পর যুক্তরাজ্যের বার্মিংহাম ইউনিভার্সিটি থেকে ফিন্যান্স অ্যান্ড অ্যাকাউন্টিংয়ে ডিসটিংশনসহ এমএসসি ডিগ্রি নেন।

সিইসি ও কমিশনারদের যোগ্যতা

সিইসি ও নির্বাচন কমিশনার পদে কাউকে সুপারিশের ক্ষেত্রে তিনটি যোগ্যতা থাকতে হবে। বাংলাদেশের নাগরিক হতে হবে। ন্যূনতম ৫০ বছর বয়স হতে হবে। কোনো গুরুত্বপূর্ণ সরকারি, বিচার বিভাগীয়, আধা সরকারি বা বেসরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত পদে বা পেশায় পদে তার অন্যূন ২০ বছর কাজের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে।

সিইসি ও কমিশনার পদের জন্য ছয়টি অযোগ্যতার কথা বলা হয়েছে। আদালত অপ্রকৃতিস্থ ঘোষণা করলে। দেউলিয়া হওয়ার পর দায় থেকে অব্যাহতি না পেলে। কোনো বিদেশি রাষ্ট্র্রের নাগরিকত্ব নিলে কিংবা বিদেশি রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য ঘোষণা বা স্বীকার করলে। নৈতিক স্খলনজনিত ফৌজদারি অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়ে কারাদণ্ডে দণ্ডিত হলে। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস (ট্রাইব্যুনালস) অ্যাক্ট-১৯৭৩ বা বাংলাদেশ কোলাবরেটরস (স্পেশাল ট্রাইব্যুনালস) অর্ডার-১৯৭২ এর অধীনে কোনো অপরাধের জন্য দণ্ডিত হলে। আইনের দ্বারা পদাধিকারীকে অযোগ্য ঘোষণা করছে না, এমন পদ ব্যতীত প্রজাতন্ত্রের কর্মে লাভজনক পদে অধিষ্ঠিত থাকলে।

নিউজটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published.

এ জাতীয় আরো খবর..

© All rights reserved © 2019 WeeklyBangladeshNY.Net
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com