বুধবার, ১৮ মে ২০২২, ১০:৪৯ পূর্বাহ্ন

চেয়ারম্যান সেলিম খানের কব্জায় ১০৬ দলিল

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ১৩ ফেব্রুয়ারী, ২০২২
  • ১৯ বার

চাঁদপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন প্রকল্পের জমি অধিগ্রহণের মাধ্যমে প্রায় সাড়ে ৩০০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টার বিষয়টি জানাজানি হলে আত্মরক্ষায় বিকল্প পথ খুঁজতে শুরু করেছে জড়িতরা। তাদের সেই চেষ্টা প্রশাসনিক বাধার মুখে থমকে যাওয়ায় বিকল্প হিসেবে এখন তারা আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন। সিন্ডিকেটের অন্তত দুজনের করা পৃথক দুটি রিটের ওপর হাইকোর্টে শুনানি চলছে।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী জানা যায়, চাঁদপুর সদর থানার লক্ষ্মীপুর মডেল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সেলিম খানের নেতৃত্বে ওই সিন্ডিকেটে সদস্য মাত্র চার-পাঁচজন। বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য নির্বাচিত সাড়ে ৬২ একর জমির জন্য চিহ্নিত ১৮২টি দলিলের মধ্যে ১৩৯টিই অস্বাভাবিক উচ্চমূল্যের। সিন্ডিকেটটি এসব দলিল সম্পাদন করে ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে বিশ্ববিদ্যালয়টি স্থাপনে খসড়া আইন পাসের পর থেকে। চাঁদপুর জেলা প্রশাসকের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, সরকারের কাছ থেকে তিনগুণ দরে অধিগ্রহণের মাধ্যমে প্রায় সাড়ে তিনশ কোটি টাকা লুটে নেওয়ার জন্য উচ্চমূল্যের এসব দলিল সম্পাদন করে তারা। বাস্তবে বাজার দর এবং সেলিম খানের আদালতে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এসব জমি ২৩ থেকে ২৪ হাজার টাকা শতাংশ দর হলেও দলিলগুলো সম্পাদন করা হয় গড়ে ২০ গুণ বেশি দরে। এক লাখ টাকা থেকে ৫ লাখ টাকা শতাংশ দরে উচ্চমূল্যের এমন দলিলের সংখ্যা ১৩৯টি। এই ১৩৯টি দলিল বিবেচনায় না নিলে বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য জমি অধিগ্রহণ ব্যয় দাঁড়ায় ১৯৩ কোটি টাকা। তবে এসব দলিল বিবেচনায় নিয়ে হিসাব করলে ব্যয় দাঁড়ায় ৫৫৩ কোটি টাকা।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, এই ১৩৯টি দলিলের মালিক যারা তারাই মূলত লুটপাটের আয়োজনে জড়িত। এসব উচ্চমূল্যের দলিলের মধ্যে ১০৬টির দলিল চেয়ারম্যান সেলিম খান ও তার পরিবারের চার সদস্যের নামে। বাকি ৩৩টি দলিলের মধ্যে জাওয়াদুর রহিম ওয়াদুদের নামে ৬টি, মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলামের নামে ৭টি, জুয়েলের নামে ৯টি এবং মো. আইয়ুব আলীর নামে ১০ দলিল রয়েছে। জানা গেছে, জড়িতরা উচ্চমূল্যের এসব দলিলের মাধ্যমে অধিগ্রহণের ফায়দা লুটতে না পেরে এখন তারা উচ্চ আদালতের হস্তক্ষেপ চেয়ে একাধিক রিট আবেদন করেছেন। আর এসব রিট মামলার শুনানিকালে জাল-জালিয়াতির আশ্রয় নিয়েছেন বলেও আদালত সূত্র জানিয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, চাঁদপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের খসড়া আইন মন্ত্রিসভা থেকে চূড়ান্তভাবে অনুমোদন পায় ২০১৯ সালের ২৩ ডিসেম্বর। জাতীয় সংসদে চাঁদপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় বিল পাস হয় ২০২০ সালের ৯ সেপ্টেম্বর। আর ১৩৯টি উচ্চমূল্যের জমির দলিল হয় ২০২০ সালের মে থেকে গত বছরের মে পর্যন্ত। জানা গেছে, উচ্চ মূল্যের দলিল সম্পাদনকারী সিন্ডিকেটটি লক্ষ্মীপুর ইউনিয়নের ১১৫ নম্বর মৌজা থেকে স্থানীয়দের কাছ থেকে চাপ প্রয়োগসহ নানাভাবে জমি ক্রয় করে। দলিল সম্পাদন করে ক্রয়কৃত ওইসব জায়গায় বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের জন্য ভূমি অধিগ্রহণ করতে সেলিম খান গত বছরের ১৭ জানুয়ারি একজন মন্ত্রী বরাবর একটি চিঠি লেখেন।

পরে ওই মন্ত্রী চিঠির ওপর স্বাক্ষর ও সুপারিশ করে ভূমি সচিবকে ওই চিঠি অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে বলেন। এরই মধ্যে জমি অধিগ্রহণের প্রশাসনিক অনুমোদন দেওয়া হয় গত বছরের ৬ এপ্রিল। প্রশাসনিক অনুমোদন পেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়টির উপাচার্য সিন্ডিকেটের ১৩৯টি দাগসহ জমির দাগ চূড়ান্ত করে অধিগ্রহণের জন্য জেলা প্রশাসককে প্রস্তাব করে। এর পর জমির মূল্যহার নির্ধারণ করতে গিয়ে সিন্ডিকেটের লুটপাটের আয়োজনের বিষয়টি স্থানীয় প্রশাসনের নজরে আসে। এ বিষয়ে গত বছরের ১৬ নভেম্বর জেলা প্রশাসক (ডিসি) অঞ্জনা খান মজলিশের দেওয়া প্রতিবেদনটিও হাইকোর্টে দাখিল করা হয়েছে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মৌজা রেটের তুলনায় অধিগ্রহণের জন্য সংগ্রহীত মূল্যহার চরম অস্বাভাবিক। অধিক উচ্চমূল্যের দলিলগুলো পর্যালোচনা করে দেখা যায়, উপাচার্য কর্তৃক প্রস্তাবিত দাগ ও উচ্চমূল্যের দলিলের দাগগুলোর মধ্যে মিল রয়েছে।

জেলা প্রশাসকের ওই প্রতিবেদনের তথ্য আরও বলছে, সম্পত্তি অধিগ্রহণ ও হুকুম দখল আইনের ৪ ধারায় নোটিশ জারির পূর্বের ১২ মাসের সব দলিল বিবেচনায় নিলে মোট প্রাক্কলন দাঁড়ায় ৫৫৩ কোটি ৭ লাখ ৭ হাজার ২৯০ টাকা। অন্যদিকে একই সময়ের অধিগ্রহণ প্রস্তাবিত ও পূর্বে অধিগ্রহণকৃত দাগ ব্যতীত দলিল বিবেচনায় নিলে মোট প্রাক্কলন দাঁড়ায় ১৯৩ কোটি ৯০ লাখ ৬৫ হাজার ৫০৭ টাকা। এ থেকে প্রতীয়মান হয়, অধিগ্রহণ প্রস্তাবিত দাগসূচির ভূমি হস্তান্তর ছিল উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। এর মাধ্যমে ভূমির মূল্যহার চরম অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি করা হয়েছে। এতে সরকারের আর্থিক ক্ষতি দাঁড়াবে ৩৫৯ কোটি ১৬ লাখ ৪১ হাজার ৭৮২ টাকা। পরে জেলা প্রশাসক ১৮২টি দলিলের মধ্যে উচ্চমূল্যের ১৩৯টি দলিল বাদ দিয়ে ৪৩ দলিল গ্রহণ করেন। একই সঙ্গে ১১৫ নম্বর লক্ষ্মীপুর মৌজার অন্যান্য সাফ কবলা দলিল বিবেচনায় নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাড়ে ৬২ একর জমির জন্য ১৯৩ কোটি ৯০ লাখ ৬৫ হাজার ৫০৭ টাকা প্রাক্কলন প্রস্তুত করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিকে প্রদান করেন।

এরই মধ্যে সিন্ডিকেট কর্তৃক সম্পাদিত ১৩৯টি দলিল বাতিল করে জেলা প্রশাসকের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সেলিম খান ভূমি সচিব বরাবর আবেদন করেন। আবেদনে বলা হয়, ডিসির ওই সিদ্ধান্তের কারণে ভূমির মালিকরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন এবং তারা ক্ষতিপূরণের টাকা নেবেন না বলে জানিয়েছেন। এই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত বছরের ১০ নভেম্বর ভূমি মন্ত্রণালয়ের ভূমি অধিগ্রহণ শাখা থেকে প্রথমে ২০২০ সালের ১৮ মে থেকে গত বছরের ১৭ মে পর্যন্ত সম্পাদিত সব দলিল বিবেচনায় নিয়ে ডিসিকে প্রাক্কলন নির্ধারণ করতে বলা হয়।

পরবর্তীতে ওই একই স্মারক সংশোধন করে উচ্চমূল্যে সম্পাদিত দলিল বাদ দিয়ে প্রাক্কলন প্রস্তুত করতে নির্দেশ দেওয়া হয়। এর পর ডিসি প্রাক্কলন চূড়ান্ত করে ভূমি অধিগ্রহণের জন্য ভিসিকে ১৯৩ কোটি ৯০ লাখ ৬৫ হাজার ৫০৭ টাকা ছাড়ের অনুরোধ করেন। এ অবস্থায় সিন্ডিকেটের সদস্য জুয়েল প্রথমে হাইকোর্টে রিট করেন। ওই রিটের প্রাথমিক শুনানি করে হাইকোর্ট টাকা ছাড়ের ওপর স্থিতিবস্থা জারি করেন। হাইকোর্টের এই আদেশের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ আপিল বিভাগের চেম্বার বিচারপতির আদালতে আবেদন জানায়। পরে চেম্বার বিচারপতি বিস্তারিত শুনানি নিয়ে হাইকোর্টের সিদ্ধান্ত স্থগিত করেন। কিন্তু তারপরও ওই টাকা এখনো পর্যন্ত ভূমি অধিগ্রহণের জন্য ছাড় হয়নি বলে জানা গেছে।

এদিকে নতুন করে আরও একটি রিট করেছেন সেলিম খান। দুটি রিটের ওপর হাইকোর্টের একটি বেঞ্চে শুনানি চলমান রয়েছে। শুনানিকালে সেলিম খান তার ফিল্ম সোসাইটির নামে ২০১৩ সাল থেকে ওইসব জমি কেনেন বলে আদালতকে জানিয়েছেন। তবে তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ সালে সেলিম খান সেখানে ৩টি জমি কিনেছেন। বাকি জমিগুলো কিনেছেন ২০১৯ সাল থেকে। তার মধ্যে ২০১৯ সালের মে মাসে তার কেনা একাধিক দলিলে জমি প্রতি শতাংশের দাম দেখা যায় ২৩ হাজার ও ২৪ হাজার টাকা। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর তার ও তার পরিবারের সদস্যসহ অন্যদের নামে যে ১৩৯টি দলিল সম্পাদন হয়েছে তার সবই হয়েছে উচ্চমূল্যে।

১৩৯টি দলিল সংক্রান্ত নথিপত্র পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২৩ একরের বেশি (২,৩০৫ শতাংশ) জমির দলিল হয়েছে চেয়ারম্যান সেলিম খান ও তার স্বজনদের নামে। এর মধ্যে সেলিম খানের ছেলে শাহিন খানের নামে ৪৪১ শতাংশ, শান্ত খানের নামে ৪২৮ শতাংশ, মেয়ে সেলিনা বেগমের নামে ৪৩০ শতাংশ ও পিংকি আক্তারের নামে ১৭৩ শতাংশ; সেলিম খানের নিজ নামে ৩৬২ শতাংশ, তার প্রতিষ্ঠান মেসার্স সেলিম এন্টারপ্রাইজের নামে ১১৮ শতাংশ। এসব জমির ক্রয়মূল্য প্রায় ৬০ কোটি টাকার কাছে। এসব জমি অধিগ্রহণ বাবদ তিনি নিতে পারতেন প্রায় ১৮০ কোটি টাকার ওপরে। এ ছাড়া অপর ৬টি দলিলে জমি রয়েছে ৫৬৮ শতাংশ (৫.৬৮ একর)। যার মূল্য প্রায় ৩০ কোটি টাকা। অধিগ্রহণের জন্য তাকে দেওয়ার প্রয়োজন প্রায় একশ কোটি টাকা। এ ছাড়া জাহিদুল ইসলামের নামে দলিল হয়েছে ১৬১ শতাংশ জমির। আইয়ুবুর রহমানের নামে রয়েছে ১০টি দলিল এবং দলীয় কর্মী জুয়েলের নামে ৩৫৩ শতাংশ জমি কেনা হয়।

এদিকে উচ্চমূল্যের দলিল সম্পাদনের ব্যাপারে জানতে চাওয়া হলে সেলিম খান বলেন, দলিলগুলো আমি ২০১৯ এবং ২০২০ সালে করেছি। উচ্চ আদালতে রিটে দেওয়া তথ্যের ব্যাপারে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, বিষয়টি উচ্চ আদালতে বিচারাধীন। এ ব্যাপারে আমি কোনো কথা বলব না। এর পর তিনি তার মোবাইল সংযোগটি বিচ্ছিন্ন করে দেন। পরবর্তীতে ফোন করা হলেও তিনি আর রিসিভ করেননি।

নিউজটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published.

এ জাতীয় আরো খবর..

© All rights reserved © 2019 WeeklyBangladeshNY.Net
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com