রবিবার, ২২ মে ২০২২, ০৪:১৭ পূর্বাহ্ন

সাত মার্চের ভাষণের নান্দনিক বৈশিষ্ট্য

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ৭ মার্চ, ২০২২
  • ২৫ বার

এ কথা বললে ভুল হবে না যে, ৭ মার্চের ভাষণটিই বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এ ভাষণেই তার সুগভীর দার্শনিক চিন্তা ও গণমুখী নেতৃত্বের সর্বোচ্চ নান্দনিক প্রকাশ ঘটেছিল। রাজনৈতিক ইতিহাসে আমরা অনেক বিশ্ববিখ্যাত ভাষণের সন্ধান পাই। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর এ ভাষণটির মতো এমন চিত্তাকর্ষক ভাষণ খুব কমই চোখে পড়ে। এই ভাষণে তিনি শুধু একটি মুক্তিপাগল জাতিকে তার চলার পথের দিশাই দেননি, পাশাপাশি তার সারাজীবনের রাজনৈতিক সংগ্রামের দুঃখ, বঞ্চনা ও ভবিষ্যৎ স্বপ্নের রূপরেখাও এক অবাক করা কাব্যিক মাধুর্যতায় তুলে ধরেছেন। সেদিন মুক্তোর মতো ঠিকরে বের হয়ে এসেছিল তার নান্দনিক ব্যক্তিত্বের বৈশিষ্ট্যগুলো। অপূর্ব ভাষাভঙ্গি, কণ্ঠের ওঠানামা, অঙ্গুলি হেলন, দাঁড়ানোর ভঙ্গি, ঘাড় ফিরিয়ে জনতার দিকে ফিরে ফিরে তাকানো, একবার চশমা পরা আবার চশমা খুলে ফেলা, মাঝে মধ্যে নিজের সঙ্গেই কথা বলা, ফের হুঙ্কার, জনতারও ফিরতি হুঙ্কার, সমুদ্রে ঝড় ওঠার মতো ধীরে ধীরে পুরো জনতাকে মুক্তির অভিমুখে এক বিস্ময়কর অভিযাত্রায় এগিয়ে নিয়ে যাওয়া এবং ছোটগল্পের মূল সুরের মতো ‘শেষ হয়েও হলো না শেষ’ ধরনের মুক্তির চূড়ান্ত বার্তাটি কাব্যময় ভাষায় প্রদান করে তিনি তার এই অমর কবিতাখানির সমাপ্তি টানেন। তার এ ভাষণের পর সবাই হয়েছিলেন সন্তুষ্ট। এককভাবে স্বাধীনতা ঘোষণার অপবাদ এড়িয়ে তিনি ঠিকই স্বাধীনতার মূলমন্ত্র পৌঁছে দিয়েছিলেন জনতার কাছে। যার যা আছে, তা-ই নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার ডাক তিনি ঠিকই দিয়েছিলেন। তাই তো এর পরের দিন থেকে তরুণ প্রজন্মের প্রতিনিধিরা যুদ্ধের প্রশিক্ষণে নেমে পড়ে। এমনকি তরুণীরাও ডামি রাইফেল নিয়ে দলে দলে প্রশিক্ষণ নিতে থাকে। মনে হচ্ছিল, পুরো দেশের মানুষই গেরিলা যুদ্ধে লিপ্ত হওয়ার আগাম প্রস্তুতিতে মেতে উঠেছিল। এর পাশাপাশি চলছিল অসহযোগ আন্দোলন। সরকার চলছিল বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে। ডজন ডজন নির্দেশনা দিয়ে তিনি একটি স্বাধীন দেশের অনুরূপ প্রশাসনকে গণমুখী চরিত্র দান করেছিলেন। অর্থনীতি, আইনশৃঙ্খলা ও সমাজ চলছিল তার নেতৃত্বে। এ ছাড়া তিনি হানাদার পাকিস্তানিদের সঙ্গে চরম ধৈর্যে নিয়ে আলাপ-আলোচনাও চালিয়ে যাচ্ছিলেন। আর এ কারণেই পুরো বিশ্ব গণতন্ত্রে অঙ্গীকারবদ্ধ এই মহান নেতার প্রতি এতটা সহানুভূতিশীল হতে পেরেছিল। এ পরিবেশ তিনিই তৈরি করেছিলেন তার ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের মাধ্যমে। তাই তো মার্কিন সাময়িকী ‘সাপ্তাহিক নিউজউইক’ এই ভাষণের পর বঙ্গবন্ধুকে ‘পোয়েট অব পলিটিক্স’ অভিধায় সম্মোধন করে।

সাময়িকীটি যথার্থই বলেছিল, ‘মুজিবের মধ্যে চিন্তাবিদ হওয়ার ভান নেই। তিনি প্রকৌশলী নন, বরং রাজনীতির কবি। কিন্তু সচরাচর বাঙালিরা কৌশলী নন, বরং কিছুটা চিন্তক এবং এ জন্যই হয়তো তার রাজনৈতিক কৌশলই দরকার ছিল এ অঞ্চলের ভিন্ন মতাদর্শ ও নানা শ্রেণির মানুষকে একত্রীকরণের জন্য।’ আর এ জন্যই কবি নির্মলেন্দু গুণের ভাষায়- “স্বাধীনতা, এই শব্দটি কীভাবে আমাদের হলো।” তাই তো কবি মোহাম্মদ রফিকের ভাষায় ‘বাঙালির শুদ্ধ নাম শেখ মুজিবুর রহমান।’ তিনিই আমাদের পুরো ইতিহাস। তার নামেই আমাদের ইতিহাসের দরজা অনায়াসে খুলে যায়। কেননা তিনিই যে বাঙালির ইতিহাসের বরপুত্র। তিনিই বাংলাদেশ।

এই ভাষণে তিনি এক নিঃশ্বাসে অনেকগুলো বিষয়ে কথা বলেছেন। ‘ভায়েরা আমার’ বলে উপস্থিত জনতাকে আপন করে নিয়ে সেদিন তিনি শুরুতেই সামগ্রিক পরিস্থিতির চুম্বক সারসংক্ষেপ তুলে ধরেন। এর পর ভুট্টোসহ পশ্চিম পাকিস্তানি রাজনীতিকদের অনৈতিক ভূমিকার কথা বলেন। সঙ্গে সঙ্গেই বলেন যে- তাদের মধ্যে যদি একজনও ন্যায় কথা জাতীয় পরিষদে বলেন, তা হলে তিনি সেটি গুরুত্বসহকারে গ্রহণ করতে রাজি আছেন। গণতান্ত্রিক বঙ্গবন্ধু এমন সংকটকালেও তার চিরদিনের অন্তর্ভুক্তিমূলক আদর্শের কথা মনে রেখেছেন। এর পর তিনি অবিলম্বে সামরিক আইন প্রত্যাহারের দাবি করেন। এর পাশাপাশি অত্যাচার ও সামরিক আগ্রাসন মোকাবিলার জন্য বাঙালিদের প্রতি আহ্বান জানান। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত অসহযোগ চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি পুরো বাঙালি জাতিকে স্বাধীনতার মন্ত্রে উজ্জীবিত হওয়ার ডাক দেন। নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও তথ্য বিভাগের কয়েক বাঙালি কর্মকর্তার প্রচেষ্টায় এ ভাষণটি রেকর্ড করা হয় এবং বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। একপর্যায় ঢাকা বেতারকেন্দ্র কর্তৃপক্ষকেও ভাষণটি প্রচার করতে বাধ্য করা হয়। এই ভাষণ নিয়ে এখন চলছে নানামুখী গবেষণা। বের হচ্ছে প্রচুর লেখা।

এ ভাষণটি যে ছিল খুবই নান্দনিক, তা প্রথম থেকেই উপস্থিত জনতা অনুভব করতে থাকেন। প্রথম পাঁচটি বাক্যেই তিনি পুরো ভাষণের সারমর্ম তুলে ধরেন। তার পর হাত দুটো পেছনে বেঁধে রেখেই সিংহের মতো ঘাড়টা ঘুরিয়ে মেঘনাদ কণ্ঠে বলে যান বাঙালির তেইশ বছরের শোষণের করুণ ইতিহাসের কথা। কী অসামান্য তার আত্মপ্রত্যয়, আত্মবিশ্বাস। এক মুহূর্তের জন্যও তাকে আনমনা হতে দেখা যায়নি। অনবরত তার মুখ থেকে ঝরছিল অগ্নিবাণী। ভাষণের মাঝামাঝি গিয়ে বলে উঠলেন ‘রক্তের দাগ এখনো শুকায় নাই।’ এর পর পেছনের হাতের বাঁধন খুললেন। ডান হাতটা তুললেন। তর্জনীটি খাড়া করলেন। আর সেই আঙুল নামেনি। বারবার তা উঠে যেতে লাগল আকাশের দিকে যেন তিনি হুকুম দিচ্ছেন। থেমে থেমে প্রতিটি বাক্য উচ্চারণ করলেন নির্দেশনার মতো করে। ওই তর্জনী নেড়েই তিনি উচ্চারণ করেছিলেন সেই অমোঘ বাণী- ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। জয় বাংলা।’ সেই ‘জয় বাংলা’ স্লোগানই ছিল মুক্তিকামী বাঙালির রণহুঙ্কার। দেরিতে হলেও সেই শব্দগুচ্ছই এখন রাষ্ট্রের জাতীয় স্লোগান হিসেবে স্বীকৃতি পয়েছে। এর পাশাপাশি আমরা বরাবরই উচ্চারণ করে থাকি ‘জয় বঙ্গবন্ধু’। হয়তো একদিন এটিও জাতীয় স্লোগানের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি পাবে। লক্ষ্য করার বিষয় এই যে, ৭ মার্চেই বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন- ‘আজ বাংলার মানুষ মুক্তি চায়, বাংলার মানুষ বাঁচতে চায়, বাংলার মানুষ তার অধিকার চায়।’ এ কারণেই এ ভাষণটি বাংলাদেশের ইতিহাসে অত্যন্ত উজ্জ্বল ও দিকনির্দেশক এক দলিল হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। এ আকাক্সক্ষার আলোকেই রচিত হয়েছে প্রজাতন্ত্রের সংবিধান। আর ওই সংবিধানই জনগণকে এ প্রজাতন্ত্রের প্রকৃত মালিক বানিয়েছে। এ সংবিধানই আমাদের অধিকারভিত্তিক অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের অনুপ্রেরণার প্রধান উৎস। ৭ মার্চের ভাষণ এবং বাঙালির অধিকার নিশ্চিত করা সংবিধানের মূল ¯্রষ্টা আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ওই ভাষণেই তিনি বাঙালির স্বাধীনতার রূপরেখা আঁকেন এই বলে যে- ‘এ দেশের মানুষ অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক মুক্তি পাবে।’ সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ এই বক্তার ৭ মার্চের ওই অমর ভাষণটি ছিল তার হৃদয় থেকে উৎসারিত। ছিল তা স্বতঃস্ফূর্ত, ছিল তা সুগঠিত। ঠাসবুনুনিতে ভরা এ ভাষণটি ছিল একই সঙ্গে আবেগ ও যুক্তিতে ভরা। কোথাও থামেননি তিনি। কিন্তু নেই কোনো পুনরুক্তি, নেই কোনো জড়তা- যেন হৃদয়ের গহিনতম তলদেশ থেক ঝলকে ঝলকে বের হয়ে এসেছে অবিরাম। কী তার শব্দচয়ন! মুখের ভাষা আর লেখার ভাষা মিলেমিশে একাকার। ‘দাবায়ে রাখতে পারবা না’ আমাদের জাতীয় রাজনৈতিক ইতিহাসে এক পরম পাওয়া। যে ভাষার মর্যাদা রক্ষার জন্য তিনি আন্দোলনের সূচনা করেছিলেন, তার কী চমৎকার ব্যবহার তিনি করেছিলেন জাতির অঙ্কুরোদ্গমের সেই মহতীক্ষণে। সত্যি ইতিহাস কথা কয় তার বলায়। ইতিহাসের অমোঘ নির্দেশনা ছিল ওই ভাষণ। বাঙালির সমূহ বঞ্চনার প্রেক্ষাপটে এক অভাবনীয় স্বপ্ননীড় রচনার কথা তিনি বলেছিলেন তার মতো করে। মাত্র কয়েক মিনিটের ভাষণ। তবু কত কথা, কত কষ্ট, কত আনন্দ। মহীকাল যেন থমকে দাঁড়িয়ে পড়ছিল একাত্তরের ৭ মার্চের সেই অপরাহ্ণে। সেদিন বঙ্গবন্ধু শ্রেষ্ঠ ধ্রুপদী গানের সুর সঞ্চার ও দ্রুতলয় এক দারুণ সুষমায় গেয়েছিলেন। ভাষণটির শিল্পমাধুর্য এমনি ছিল যে, বক্তা ও শ্রোতার কেউই খেই হারাননি এমন অর্কেস্ট্রার পরিবেশে। চয়িত শব্দের এক অসাধারণ মালা গেঁথেছিলেন বাঙালির স্বপ্নের ধন রাজনীতির এই মহাকবি। নিঃসন্দে জাতিসংঘ যথার্থই এ ভাষণকে বিশ্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যিক সম্পদের অংশ করে নিয়েছে। নান্দনিক বৈশিষ্ট্যের কারণেই এ ভাষণ পুরো বিশ্বের মুক্তিকামী মানুষকে পথ দেখাবে চিরদিন। ৭ মার্চ সকালে বঙ্গমাতা বঙ্গবন্ধুকে বলেছিলেন, তিনি যেন নিজের মনের কথা বলেন। বঙ্গমাতা বলেছিলেন- ‘মনে রেখো, মানুষ আজ অনেক আশা নিয়ে তোমার দিকে তাকিয়ে আছে। তাদের তুমি নিরাশ করো না।’ নিঃসন্দেহে তিনি তাদের হতাশ করেননি। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ রেহানা এক লেখায় জানিয়েছেন, ‘বাংলাদেশের মানুষের কথা আজ তিনিই উচ্চারণ করলেন।’ তিনি আরও লিখেছেন যে, তার মাও খুশি হয়েছিলেন এই ভাষণ শুনে। শেখ রেহানার ভাষায়- ‘আমার মায়ের মুখের হাসি দেখেছিলাম ¯িœগ্ধতার শুভ্রতারা।’ সত্যি অবাক হই এই ভেবে যে- তিনি কেমন করে সব বাঙালির মনের কথা, মুখের কথা ও প্রাণের কথা এমন করে আত্মস্থ করতে পেরেছিলেন এবং তাদের চাওয়ার আলোকে এ অমর ভাষণটি দিয়েছিলেন।

তার ব্যক্তিত্বের এমন নান্দনিক স্ফুরণ এই ভাষণে যেভাবে ঘটেছে, তা সত্যি বিরল এক উপাখ্যান। বহুমাত্রিক বঙ্গবন্ধুর চরিত্রের শৈল্পিক আদলটি ধরতে চাইলে তার ৭ মার্চের ভাষণটিই যথেষ্ট। আমাদের বিশ্বাস- সার্বিক মুক্তির যে অন্বেষায় আজ বাঙালি নিবেদিত, বঙ্গবন্ধুর ভাষণগুলো, বিশেষ করে ৭ মার্চের ভাষণটি, তার অনেকটাই দিশা দিতে সক্ষম। তাই আসুন এ ভাষণের মর্মবাণী পৌঁছে দিই বাংলাদেশের ঘরে ঘরে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের কাছে।

 

ড. আতিউর রহমান : বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও বঙ্গবন্ধু চেয়ার অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর

নিউজটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published.

এ জাতীয় আরো খবর..

© All rights reserved © 2019 WeeklyBangladeshNY.Net
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com