বুধবার, ১৮ মে ২০২২, ০৩:৪২ অপরাহ্ন

৯২ ভাগ ওয়ারেন্টের আসামি লাপাত্তা

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২১ মার্চ, ২০২২
  • ২২ বার

কোনো ফৌজদারি মামলার ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে যেমন সাক্ষী দরকার, তেমনি প্রয়োজন আসামির উপস্থিতিও। বাদী ও আসামি উভয়ই ন্যায়বিচার চান। কিন্তু এ বিচারের প্রধান প্রতিবন্ধকতা সাক্ষী কিংবা আসামির অনুপস্থিতি। বছরের পর বছর চলে গেলেও কোনো মামলার পলাতক আসামি যদি গ্রেপ্তার না হয়, তা হলে বিচার নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। ঢাকার নিম্ন আদালত ও পুলিশের সংশ্লিষ্ট বিভাগের তথ্য বিশ্লেষণ এবং আমাদের সময়ের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, পলাতক আসামিদের প্রায় ৯২ শতাংশই অধরা। অথচ সেই আসামিদের কারও কারও সঙ্গে পুলিশের ওঠাবসার অভিযোগ রয়েছে। রাজনৈতিক সভা-সমাবেশে ওয়ারেন্টের আসামিদের সঙ্গে পুলিশের দহরম-মহরমের অভিযোগ পাওয়া যায়। কক্সবাজারের চকরিয়া থানায় হত্যাচেষ্টা মামলার পলাতক আসামি আরহান মাহমুদ ওরফে রুবেলকে জন্মদিনে সম্প্রতি ওসি মুহাম্মদ ওসমান গণি কেক খাইয়ে দেওয়ার ছবি ভাইরাল হয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, কিছু ক্ষেত্রে ওয়ারেন্ট তামিলের বিষয়টি থানা পুলিশের কাছে গুরুত্ব পায় না। আবার পুলিশের সঙ্গে আসামিদের দহরম-মহরমের অভিযোগও রয়েছে। ঢাকা মেট্রোপলিটান পুলিশের (ডিএমপি) সাম্প্রতিক এক পর্যবেক্ষণে পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তার না হওয়ায় অসন্তোষের তথ্য মিলেছে।

বিচারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, পলাতক ও ওয়ারেন্ট আসামিদের কারণে হাজার হাজার মামলার বিচারকাজ বছরের পর বছর ধরে থমকে আছে। ফলে বিচার প্রার্থীদের দুর্ভোগও সীমাহীন। থমকে থাকা মামলার বিচার কাজ ত্বরান্বিত করতে ৯০ দশকের জনপ্রিয় চিত্রনায়ক সোহেল চৌধুরী হত্যা মামলায় ব্যবসায়ী আজিজ মোহাম্মদ ভাই ওরফে আবদুল আজিজসহ তিনজনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন আদালত।

প্রাপ্ত তথ্য বলছে, ডিএমপির গ্রেপ্তারি পরোয়ানার (ওয়ারেন্ট) ৯২ শতাংশ আসামিই গ্রেপ্তার হচ্ছে না। ডিএমপির ৫০টি থানায় গত ডিসেম্বর পর্যন্ত ৩২ হাজার ৫১টি ওয়ারেন্ট ঝুলে আছে। এর মধ্যে জিআর (জেনারেল রেজিস্ট্রার) মামলার পরোয়ানা ২০ হাজার ২৩৪টি এবং সিআর (কোর্ট রেজিস্ট্রার) মামলার পরোয়ানা ১১ হাজার ৮১৭টি। ওয়ারেন্টের আসামি গ্রেপ্তার না হওয়ার পেছনে পুলিশের আন্তরিকতার অভাব ও আসামিদের সঙ্গে যোগসাজশের অভিযোগ করেছে সংশ্লিষ্টরা।

পুলিশ জানায়, প্রতি মাসে যে পরিমাণ গ্রেপ্তারি পরোয়ানা তামিল হয়, তার চেয়ে অনেক বেশি নতুন পরোয়ানা জমা হয়। এ কারণে বিপুলসংখ্যক পরোয়ানা ঝুলে থাকছে। এ ছাড়া থানা-পুলিশের তদন্তসহ অন্যান্য কাজের ভিড়ে পরোয়ানা তামিলের বিষয়টি সেই অর্থে গুরুত্বও পায় না। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ কিংবা প্রভাবশালীদের চাপ থাকলে সে ক্ষেত্রে পরোয়ানার আসামি গ্রেপ্তারের তৎপর হয় পুলিশ।

অভিযোগ রয়েছে, পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে পরোয়ানাপ্রাপ্ত আসামিদের যোগসাজশে আসামিরা গ্রেপ্তার এড়িয়ে চলে। দীর্ঘদিন বিপুলসংখ্যক গ্রেপ্তারি পরোয়ানা নিয়ে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছেন আসামিরা। পরোয়ানার আসামি প্রভাবশালী হলে তাকে গ্রেপ্তারে পুলিশের অনীহা থাকে।

সম্প্রতি গ্রেপ্তারি পরোয়ানা তামিলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা প্রসঙ্গে ডিএমপি পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ও সাজা পরোয়ানা তামিলে ডিএমপির আওতাধীন থানাগুলোর কার্যক্রম সন্তোষজনক নয়। এ ছাড়া এক থানার সঙ্গে অন্য থানা কিংবা এক বিভাগের সঙ্গে অন্য বিভাগের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা তামিলের ক্ষেত্রে ব্যাপক তারতম্যও রয়েছে।

গত ১৭ ফেব্রæয়ারি গ্রেপ্তারি পরোয়ানা তামিলের আবেদন জানিয়ে ডিএমপি কমিশনার বরাবর চিঠি দেন প্রশিকার মানবিক উন্নয়ন কেন্দ্রের প্রধান নির্বাহী সিরাজুল ইসলাম। সিরাজুল ইসলাম চিঠিতে উল্লেখ করেন, ২০০৯ সালের ২৪ মে গভার্নিং বডি তৎকালীন চেয়ারম্যান কাজী ফারুক আহমেদকে অপসারণ করেন। কর্মী কল্যাণ তহবিলের অর্থের অপচয় ও তসরুপের অভিযোগে অনেক কর্মী তার বিরুদ্ধে মামলা করে। কাজী ফারুকের বিরুদ্ধে ১৪টি মামলা ও ১২টি গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে। গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ও ৫ বছরের জেল হওয়া সত্তে¡ও সেই ব্যক্তি অবাধে চলাফেরা করছেন। এ ছাড়া রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ না করায় পাঁচটি মামলায় পাঁচ বছরের জেল হয়। ২০১৯ সালের ২৪ মার্চ ব্যাংকটির পক্ষ থেকে আইজিপি বরাবর একটি চিঠিতে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা তামিলের আবেদন করা হয়। তবে দীর্ঘ গ্রেপ্তারি পরোয়ানা মাথায় নিয়েই তিনি ঘুরে বেড়াচ্ছেন।

জানা গেছে, গড়ে ৯২ ভাগ পরোয়ানার আসামি গ্রেপ্তার না হওয়ায় ডিএমপির গত ফেব্রুয়ারি মাসের অপরাধ পর্যালোচনা সভায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। ডিএমপির ৮টি অপরাধ বিভাগের ডিসিকে চিঠি দেওয়া হয়। গত ৭ ফেব্রুয়ারি ডিএমপি কমিশনার শফিকুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে বলা হয়, পুলিশ আইন ১৮৬১-এর ২৩ ধারা অনুযায়ী পুলিশের দায়িত্ব ও কর্তব্যের মধে অন্যতম হচ্ছে সব ধরনের জারি হওয়া গ্রেপ্তারি পরোয়ানা দ্রুত সময়ের মধ্যে কার্যকর করা। মূলত ওয়ারেন্ট তামিলে সফলতা ছাড়া অপরাধ ব্যবস্থাপনায় সফলতা অর্জন সম্ভব নয়।

ওয়ারেন্ট নিষ্পত্তি ও কার্যকরের ক্ষেত্রে নির্দেশনায় বলা হয়, থানার ইন্সপেক্টর অপারেশন-এর এবং জোনাল সহকারী কমিশনারের নেতৃত্বে ওয়ারেন্ট তামিল ত্বরান্বিত করতে একটি টিম গঠন করা হবে। থানার এসআই ও এএসআইদের মাসিক লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে তিন মাস পরপর কাজের ভিত্তিতে পুরস্কার ও তিরস্কারে ব্যবস্থা করা হবে। ওয়ারেন্ট তামিলে আশাব্যঞ্জক ফল অর্জনে ব্যর্থ হলে বিষয়টি থানার অফিসার ইনচার্জসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বার্ষিক মূল্যায়নে উল্লেখ করা এবং এ বিষয়ে তাদের সতর্ক করবে ডিএমপি।

ওয়ারেন্ট নিষ্পত্তির হার পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ডিএমপির আটটি অপরাধ বিভাগের মধ্যে শুধু মিরপুর ও তেজগাঁও বিভাগে মোট ওয়ারেন্টের অর্ধেকের বেশি (১০ হাজার ৬৩৯টি) ঝুলে আছে। ওয়ারেন্ট নিষ্পত্তিতে মোহাম্মদপুর থানা সবচেয়ে পিছিয়ে, যার হার ৩.১৬ শতাংশ। এর পর আদাবর থানা ৪.০১ শতাংশ, যাত্রাবাড়ী ৪.৭৯ শতাংশ, শিল্পাঞ্চল ৫.৭০ শতাংশ, দারুস সালাম ৬.১২ শতাংশ, রূপনগর ৬.২০ শতাংশ, ভাষানটেক ৬.৫৫, পল্লবী ৭.৩২, মিরপুর ৭.৬৮ ও শেরেবাংলানগর ৭.৭৮ শতাংশ। এদিকে ওয়ারেন্ট নিষ্পত্তিতে সবচেয়ে এগিয়েছে মতিঝিল থানা (৪৭.৬৮ শতাংশ) এবং উত্তরা পূর্ব থানা (৪৪.৪৮ শতাংশ)।

পুলিশের মতিঝিল বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মো. আ. আহাদ আমাদের সময়কে বলেন, ‘মতিঝিল বিভাগে ওয়ারেন্ট নিষ্পত্তিতে বিশেষ অভিযান চালানো হয়েছে। ওয়ারেন্টগুলোকে আমরা কয়েকটি শ্রেণিতে ভাগ করেছি। এর পর গুরুত্ব অনুযায়ী সেগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি করার জন্য পুলিশ সদস্যদের দায়িত্ব দেওয়া হয়। দায়িত্ব ঠিকঠাক পালনের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা নিবিড় তদারকি করে। ফলে এ সাফল্য এসেছে।’ মতিঝিল থানার কর্মকর্তারা বলেন, ওয়ারেন্ট তামিলের জন্য থানায় নির্দিষ্ট কয়েকজন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রয়েছে। তারা পরিকল্পনমাফিক কাজ করেছেন।

ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান পিপি (পাবলিক প্রসিকিউটর) আবদুল্লাহ আবু আমাদের সময়কে বলেন, পরোয়ানাপ্রাপ্ত আসামিদের গ্রেপ্তারে পুলিশের আন্তরিকতা আরও বাড়ানো দরকার। আর যেসব পরোয়ানা তামিল করা যাচ্ছে না, সেসব বিষয়ে পুলিশের উচিত আদালতে প্রতিবেদন দেওয়া। এ ক্ষেত্রে পুলিশ যথাযথ দায়িত্ব পালন করলে দ্রুত নিষ্পত্তি ও অপরাধীদের সাজা আরও সহজ হবে।

পদস্থ পুলিশ কর্মকর্তা ও আইনজীবদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা তামিলের বিষয়টি থানা পুলিশ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই গুরুত্বের সঙ্গে নেয় না। ওয়ারেন্ট তামিলের জন্য এসআই, এএসআই ও কনস্টেবলদের দায়িত্ব দেওয়া হয়। পুলিশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বিষয়টি যথাযথভাবে মনিটরিং করার ব্যাপারে গাফলতি রয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে আসামিদের সঙ্গে দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ সদস্যের সমঝোতা হয়। এ কারণে পরোয়ানা তামিল কম হয়।

এ বিষয়ে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারের উপকমিশনার ফারুক হোসেন বলেন, ‘প্রতিদিন যে পরিমাণ পরোয়ানা তামিল হয়, তার চেয়ে বেশি নতুন পরোয়ানা আসে। এসব পরোয়ানা দ্রæত তামিল করতে থানা পুলিশকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আমরা পরোয়ানা কার্যকরের ব্যাপারে পুরস্কার ও তিরস্কারের ব্যবস্থা করেছি। আরও কীভাবে দ্রæততার সঙ্গে ওয়ারেন্ট নিষ্পত্তি করার হয়, সে ব্যাপারে কাজ চলছে।’

নিউজটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published.

এ জাতীয় আরো খবর..

© All rights reserved © 2019 WeeklyBangladeshNY.Net
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com