সোমবার, ২৩ মে ২০২২, ০৮:৫৭ অপরাহ্ন

জাতীয় সরকার ফর্মুলা নিয়ে রাজনীতির মাঠে আলোচনা

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ৪ এপ্রিল, ২০২২
  • ১৯ বার

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে নির্বাচনকালীন সরকারসহ বিএনপির জাতীয় সরকার ফর্মুলা নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে তুমুল আলোচনা শুরু হয়েছে। যদিও নির্বাচনের দেড় বছরের বেশি এখনো বাকি। তবে এরই মধ্যে রাজনীতির মাঠে উত্তাপ ছড়াতে শুরু করেছে।

সম্প্রতি বিএনপির পক্ষ থেকে নতুন ফর্মুলা দেওয়া হয়। সেখানে বলা হয়েছে- নির্বাচন হতে হবে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে; ওই নির্বাচনে বিজয়ী হলে গণতান্ত্রিক দলগুলোকে

নিয়ে জাতীয় সরকার গঠন করা হবে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও তার জোট বিএনপির এ ফর্মুলাকে অসাংবিধানিক বলে মন্তব৬্য করেছে। জাতীয় পার্টি বলেছে জাতীয় সরকার নিয়ে তাদের কোনো আগ্রহ নেই। বাম জোট বলছে, বিএনপির জাতীয় সরকার মানে ঘোড়ার আগে গাড়ি জুড়ে দেওয়া। অবশ্য এ ফর্মুলাকে সমর্থন জানিয়েছে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০-দলীয় জোটের দলগুলো। এ ছাড়া বেশ কিছু রাজনৈতিক দল বলছে, গণতান্ত্রিক ধারায় ফিরতে হলে নির্বাচনের আগেই জাতীয় সরকার হতে হবে। এ সরকারকে কমপক্ষে দুই-তিন বছর সময় দিতে হবে।

এ অবস্থায় দলগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক সমঝোতা হওয়া উচিত বলে মনে করেন সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার। তিনি বলেন, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে রাজনৈতিক সমঝোতা। ৯১ সালে সমঝোতার ভিত্তিতে তিন জোটের রূপরেখা প্রস্তুত করা হয়েছিল। এবারও এ সমঝোতার মাধ্যমে ঠিক করা যেতে পারে কীভাবে কোন প্রক্রিয়ায় নির্বাচন হবে। নির্বাচনের পর যারা সরকারে আসবে তারা কী করবে, কোন কোন ক্ষেত্রে সংস্কার আনবেÑ সুস্পষ্ট বিষয়ে সমঝোতা হতে পারে। রাজনৈতিক সমঝোতার ভিত্তিতে জাতীয় সনদ প্রতিষ্ঠা করি, সেখানে যদি সবাই স্বাক্ষর করি, সেখানে সুষ্ঠু নির্বাচনের পথ সুগম হতে পারে। এ জাতীয় সনদের কাজ হবে কীভাবে নির্বাচন হবে এবং নির্বাচনের পরে কী হবে। রাজনৈতিক দলগুলোর সমঝোতার মাধ্যমে কোনো কিছু হলে সেখানে আওয়ামী লীগও থাকতে পারে।

বিএনপির ফর্মুলা প্রসঙ্গে বদিউল আলম বলেন, বিএনপি জাতীয় সরকারের যে ফর্মুলা দিয়েছেÑ এটা থিওরিটিক্যালি আকর্ষণীয়, তত্ত্বগতভাবে সবাইকে নিয়ে কাজ করা। উদ্দেশ্য হচ্ছে রাজনৈতিক বিরোধের অবসান ঘটানো। কিন্তু কীভাবে কার্যকর করবে তার ওপর সবকিছু নির্ভর করবে। এ জাতীয় সরকার নাম দিয়ে অনেক কিছু করা সম্ভব।

জাতীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠান অথবা নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের পর জাতীয় সরকার গঠনÑ এ প্রসঙ্গ তিনি বলেন, দেশের বর্তমান যে পরিস্থিতি তাতে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন করা দলীয় সরকারের অধীনে সম্ভব নয়। এ অবস্থায় নিরপেক্ষ সরকার, নাকি জাতীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন এটা বলা বড় দুরূহ। তবে এটা ঠিক বর্তমান পরিস্থিতিতে দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়।

বিএনপি নেতাদের কোনো কথাতেই বিশ্বাস নেই আওয়ামী লীগের সভাপতিমÐলীর সদস্য ফারুক খানের। তিনি বলেন, বিএনপির কোনো কথাতেই আমি বিশ্বাস করি না। তারা সংবিধান তথা মানুষের অধিকারের বিষয়টি মাথায় রেখে কথা বলে না। তারা মানুষকে বোকা বানানোর অভিপ্রায়ে কিছু দলকে কাছে ডাকছে। যেসব দলের জনভিত্তি নেই এমন কিছু দল হয়তো আসবেও। তবে তাদের মাথায় থাকা উচিত মানুষকে এখন আর বোকা বানানো যাবে না। বিএনপি নেতাদের প্রতি মানুষের বিশ্বাস তো দূরের কথা তাদের নেতাকর্মীদেরই বিশ্বাস নেই। মূলত তাদের কাছে জাতীয় সরকার মানে বিএনপি-জামায়াত। এর বাইরে তাদের খুব একটা চিন্তা নেই। দেশ, জনগণ ও সংবিধান তাদের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়।

আওয়ামী লীগের আরেক সভাপতিমÐলীর সদস্য আবদুর রহমান বলেন, সংবিধানে জাতীয় সরকারের কোনো প্রভিশন নেই। তা ছাড়া এটির প্রয়োজনীয়তা আছে বলেও আমরা মনে করি না। এটি একটি অসাংবিধানিক কনসেপ্ট। নির্বাচন হবে একটা অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশনের অধীনেÑ এটা আমাদেরও প্রত্যাশা। সংবিধানের প্রতি যাদের আস্থা আছে রাজনৈতিক শিষ্টাচার ও সংস্কৃতিতে বিশ^াসী তারা নির্বাচনে আসবে বলে বিশ^াস করি।

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান নিতাই রায় চৌধুরী বলেন, আমাদের দলের বক্তব্য স্পষ্ট, আগামীতে ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠায় সরকার পতন আন্দোলনে যারা রাজপথে থাকবে তাদের গণতন্ত্রের বন্ধু হিসেবে চিহ্নিত করব আমরা। এ সরকারের পতন ঘটানোর পর আলোচনার ভিত্তিতে একটি নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার প্রতিষ্ঠা করা হবে। ওই সরকারের অধীনে দেশের মানুষ যদি স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারে এবং বিএনপি সরকার গঠনের সুযোগ পায়, তা হলে দলীয় সরকার নয়, গণতন্ত্রের পক্ষে অবস্থান গ্রহণ করা রাজনৈতিক দল বা ব্যক্তিদের নিয়ে একটি জাতীয় সরকার গঠন করবে। এ জাতীয় সরকারে শুধু নির্বাচিতরাই নয়; পরাজিতরাও থাকবেন। কিন্তু গণতন্ত্র হত্যাকারী হিসেবে আওয়ামী লীগ বা তাদের সহযোগী কারও স্থান হবে না।

জাতীয় সরকারের কার্যক্রম সম্পর্কে তিনি বলেন, যারা ভোটাধিকার হরণকারী, গণতন্ত্র হত্যাকারী, নির্যাতনকারী, লুটেরা, অর্থপাচারকারী, বিচার বিভাগসহ রাষ্ট্রের সব প্রতিষ্ঠানকে দলীয়করণসহ নানাভাবে ধ্বংসকারীদের আইনের আওতায় আনা হবে। পাশাপাশি দেশে গণতান্ত্রিক ধারা চালু এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠায় একটি কর্মসূচি ঠিক করে রাষ্ট্র মেরামতে কাজ করবে এ জাতীয় সরকার।

নির্বাচনের আগেই জাতীয় সরকার গঠনের প্রস্তাব তুলেছেন কেউ কেউ- এ প্রসঙ্গে নিতাই রায় বলেন, আওয়ামী লীগ বড় চালাক দল। যখন দেখবে খুব চাপে পড়ছে তখন বিরোধী দলগুলোকে বলবে আসুন আমরা আলোচনা করে সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচনকালীন সরকার গঠন করি। যাতে বিরোধী দলগুলো বিভ্রান্তিতে পড়ে যায়। এভাবেই ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির আগে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে একটি সর্বদলীয় সরকার গঠনের কথা বলা হয়েছিল।

জাতীয় পার্টির মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু বলেন, বিএনপির জাতীয় সরকারের দাবিতে আমাদের আগ্রহ নেই, কোনো মন্তব্যও নেই। আমাদের কথা হচ্ছে নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে। আমরা মনে করি পার্লামেন্টে প্রতিনিধিত্বকারী দলের সদস্যদের সমন্বয়ে নির্বাচনকালীন সরকার হওয়া উচিত।

গণঅধিকার পরিষদের আহ্বায়ক ড. রেজা কিবরিয়া বলেন, প্রথমত, আমরা নির্বাচনের আগে যে জাতীয় সরকারের কথা বলছি, সেখানে আওয়ামী লীগের কারো স্থান হবে না। দ্বিতীয়ত আওয়ামী লীগ সরকার ভোট চুরিসহ রাষ্ট্রের মধ্যে দলীয়করণ করে করে যে ভিত তৈরি করেছে, তা ভাঙ্গতে হলে সময়ের প্রয়োজন। দুই থেকে তিন বছর লাগবে। এখানেই আমাদের সঙ্গে বিএনপির মতের অমিল। বিএনপি বিশ্বাস করে, শেখ হাসিনা সরকারে না থাকলে সবাই বিএনপির দিকে চলে আসবে। এটিকে আমরা বাস্তবসম্মত মনে করছি না। আ স ম আবদুর রব ও মাহমুদুর রহমান মান্নার সঙ্গে এ নিয়ে তার কথা হয়েছে। তাদের অবস্থানও নির্বাচনকালীন জাতীয় সরকারের পক্ষে। এ সরকার ভোটের পরিবেশসহ সব কিছু ঠিক করে একটি অবাধ সুষ্ঠু গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পরিবেশ সৃষ্টি করবে।

বাম গণতান্ত্রিক জোটের সমন্বয়ক ও বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, দেশের বাস্তবতায় প্রধান প্রশ্ন হচ্ছে ভোটের অধিকার নিশ্চিত করা। আমরা মনে করি দলীয় সরকারের অধীনে নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব নয়। তাই নির্বাচনকালীন তদারকি সরকার আমরা চাই। আমাদের প্রধান এজেন্ডা হবে এ ইস্যুতে সরকারকে পদত্যাগে বাধ্য করা। কিন্তু তার আগে জাতীয় সরকারের বিষয়টা নিয়ে আসা মানে ঘোড়ার আগে গাড়ি জুড়ে দেওয়া। প্রথম প্রশ্ন হচ্ছে, ভোটাধিকারসহ গণতান্ত্রিক অধিকারের প্রশ্ন। রাজপথের ক্রিয়াশীল দলগুলোর মধ্যে সংবিধান, রাষ্ট্র, প্রতিষ্ঠানগুলোকে সংস্কার করার প্রশ্নে বিশ্বাসযোগ্যভাবে দলগুলোর বোঝাপড়াও দরকার। বিএনপির জন্য যেমন দরকার, বিরোধী দলগুলোর মধ্যেও দরকার। তা হলেই আন্দোলন শক্তিশালী ও বিশ্বাসযোগ্য হবে।

সাইফুল হক বলেন, বিএনপিকে আরও দায়িত্বশীল, অগ্রণী ভ‚মিকা নিতে হবে। তার পর নির্বাচন, সরকার গঠনÑ আরও পরে। এটি না হলে বহু বিভ্রান্তির অবকাশ থাকে। এমন প্রস্তাবের পেছনে ক্ষমতাকেন্দ্রিক নানা রাজনীতির ভিত্তি হলো এমপি-মন্ত্রী হওয়া। ক্ষমতার জন্য যেসব শরিক দল রাজনীতি করে, তাদের আশ্বস্ত করতে এটি বলা হয়ে থাকতে পারে।

নিউজটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published.

এ জাতীয় আরো খবর..

© All rights reserved © 2019 WeeklyBangladeshNY.Net
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com