সোমবার, ২৩ মে ২০২২, ০৬:৫০ অপরাহ্ন

মানুষকে নিজের শক্তিতেই দাঁড়াতে হবে

ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১১ এপ্রিল, ২০২২
  • ২২ বার

খুব মর্মস্পর্শী একটা কথা পেলাম ছোট পেটে সন্তানের জায়গা হয়, বড় ফ্ল্যাটে মায়ের জায়গা হয় না। বুকটা কেমন করে যেন হু-হু করে কেঁদে উঠল। অথচ কান্নাটা পানি হয়ে চোখে এলো না। বোবাকান্নাটা বুঝি এমনই হয়। যা বরফের মতো বুকে জমে থাকে, আর্তনাদ করে, নিজের আগুনে নিজে পুড়ে অথচ বন্দিত্ব থেকে বেরিয়ে আসতে পারে না। একটা মানুষ মরে গেছে। শরীরটা আছে, জীবনটা নেই। মানুষ মরে গেলে লাশ হয়ে যায়। মানুষের কাছে তখন এর দামই বা কতটুকু। খোলা আকাশের নিচে খোলা কফিনের ওপর লাশটা। হঠাৎ বৃষ্টি এলো। লাশটাকে ঘিরে থাকা লোকজন কোনোমতে কফিনের ভেতরের লাশটাকে পলিথিন দিয়ে ঢেকে নিজেরা ঘরের ভেতরে আশ্রয় নিল। খুব অসহায় একটা অবস্থা লাশটার। বেঁচে থাকতে যে দাবি করত এই ঘরগুলো তার। ঘরের ভেতরে সিন্দুকে জমানো সোনা-গয়না, টাকা-পয়সাগুলো তার। সেই লোকটা আজ ঘরের বাইরে বৃষ্টির সঙ্গে লড়ছে আর মানুষগুলো তার ঘরের ভেতর নিরাপদ আশ্রয় নিয়েছে। মানুষ মরে গেলে এমন করেই একটা মূল্যহীন শরীরে পরিণত হয়। তখন কোনো কিছুই তার থাকে না। বেঁচে থাকতে মানুষ ঘর পায়, মরে গেলে মানুষ ঘর হারায়। খুব অদ্ভুত এক ফিলোসফি। যেটা বেঁচে থাকতে মানুষ বুঝতে চায় না, মরে গেলে সেটা বুঝতে পারে কিনা কেউ জানে না। সেটা খুব রহস্যময়, খুব অনিশ্চিত। সব রহস্যের উদ্ঘাটন করা যায় না, কোনো কোনো রহস্য রহস্যই থাকতে ভালোবাসে। পৃথিবীটা এমন একটা জায়গা যেখানে মানুষ সবকিছু চাইলেও জানতে পারে না। কিছু কিছু বিষয় মানুষকে বুঝে নিতে হয়। উপলব্ধি করতে হয়। যেটা বইয়ের ভেতরের কঠিন কঠিন শব্দের মধ্যে থাকে না। মানুষের ভেতরেও থাকে না। তার পরও প্রতীকী একটা নিদর্শন থাকে, যা চোখ দেখে না, মন বুঝে। যেমন অনেক সিনেমায় আমরা দেখি পাখিগুলো বন্দিদশা থেকে মুক্ত হয়ে আকাশে উড়ছে। এখানে যেটা বোঝানো হচ্ছে সেটা হলো কিছুক্ষণ আগেও একটা মানুষের শরীরের ভেতর জীবনের অস্তিত্ব ছিল। কিন্তু শরীরটা এখনো আগের মতো থাকলেও শরীরের ভেতর জীবনের অস্তিত্ব ধরে রেখেছিল যে অদৃশ্য শক্তি তা মুক্ত হয়ে গেছে। মানুষটা আর বেঁচে নেই, মরে গেছে। বিষয়গুলো খুব সাধারণ মনে হতে পারে। তবে সাধারণের ভেতরে যে সত্য লুকিয়ে থাকে তা অসাধারণ ধারণাকেও হার মানায়।

পথের পাঁচালি সিনেমা করতে গিয়ে সত্যজিৎ রায়ের বিভ‚তিভ‚ষণের লেখাটা মনে পড়ে গেল, ‘পঁচাত্তর বৎসরের বৃদ্ধা, গাল তোবড়াইয়া গিয়াছে, মাজা ঈষৎ ভাঙিয়া শরীর সামনের দিকে ঝুঁকিয়া পড়িয়াছে…।’ এমন একটা অদ্ভুত গড়নের মানুষ কোথায় পাবেন তিনি। অবশেষে খুঁজতে খুঁজতে কলকাতার পতিতাপল্লীর ভাঙা দাওয়ায় খোঁজ মিলল মানুষটার। চুনীবালা দেবী নামের মানুষটা চরিত্রের প্রয়োজনে এভাবেই হয়ে উঠলেন সত্যজিৎ রায়ের ইন্দির ঠাকুরণ। দৃশ্যের একটা জায়গায় এমন ছিল অপু ও দুর্গা ঝোপঝাড়ের মধ্যে ইন্দির ঠাকুরণকে অনেকটা জড়োসড়ো হয়ে দেখতে পেল। খুব সন্তর্পণে কাছে এসে পিসি পিসি বলে ডাকতে ডাকতে ঝাঁকুনি দিতেই ইন্দির ঠাকুরণকে মাটিতে গড়িয়ে পড়তে দেখল তারা। তখন দুর্গা আর অপু বোঝেনি তার পিসির কী হয়েছে। ইন্দির ঠাকুরণের সেই পুরাতন ঘটিটা গড়াতে গড়াতে পানিতে এসে পড়ল। ভেসে গেল পানির স্রোতে। যেভাবে ভেসে যায় মানুষের জীবন, মৃত্যুর কাছে। অবাক বিস্ময়ে অপু ও দুর্গা দেখল জীবনের এক নির্মম বাস্তবতাকে। সে জীবন সত্যের নির্মম গানটা বেজে উঠল এভাবেই- ‘হরি দিন তো গেল সন্ধ্যা হলো, পার করো আমারে।’ সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো সিনেমাটি মুক্তি পাওয়ার আগেই চুনীবালা দেবী মৃত্যুবরণ করেছিলেন। কিন্তু অভিনয়ের মৃত্যু বাস্তব জীবনের মৃত্যুকেও যেন হার মানিয়েছিল। কেউ কেউ বলেছেন, সময় মানুষকে বদলায় না, সময় শুধু মানুষের মুখোশ উন্মোচন করে। কথাটা খুব সাধারণ বলে মনে হলেও এর অসাধারণ দর্শনটা খুব গভীর। মানুষ নিজে বদলায় অথচ সে দোষটা চাপিয়ে দেয় সময়ের ওপর। মানুষ তো এমনই হয়, যতই দোষ করুক, সে দোষটা কীভাবে অন্যের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে নিজেকে সুরক্ষিত রাখা যায় সে মনস্তত্ত¡ মানুষকে সব সময় প্রভাবিত করে। মানুষ সময়কে বোকা ভাবে। সময়কে মূল্যহীন ভাবে। কিন্তু সময় যখন আয়না হয়ে যায় তখন সময় মূল্যবান হয়ে মানুষকে মূল্যহীন করে দেয়। সময়ের আয়নায় মানুষের মুখোশটা খসে পড়তে দেখা যায়, যেখানে মুখটা মুখোশের নিচে ঝুলে থাকে। আয়নার ভেতরের মানুষটা কে? মানুষটা কি নিজে না অন্য কেউ? খুব জটিল এক দর্শনতত্ত¡ যা মনস্তত্ত¡কে হার মানায়। তবে আয়না নিয়ে প্রচলিত ধারণা কিংবা গল্প, উপন্যাসগুলোর মধ্যেও এক ধরনের বিচিত্র চিন্তার উন্মেষ ঘটেছে। ইংরেজ কবি ও লেখক জিওফ্রে চসারের ‘দ্য ক্যান্টারবেরি টেলস’ গল্পে টারটারির রাজা কাম্বুস্কানের এক অদ্ভুত আয়নার কথা বলা হয়েছে, যে আয়না দেখে তিনি আগে থেকেই বলে দিতে পারতেন ভবিষ্যতে কী ঘটবে। জাপানের অপরাধীদের অপরাধের সত্যতা যাচাই করার জন্য এক সময় তাদের মুখের সামনে আয়না ধরা হতো। আয়নার ভেতরে অপরাধীর মুখের যে পরিবর্তন ঘটত তা থেকে তার সত্য-মিথ্যা যাচাই করা হতো। আইরিশ সাহিত্যিক অলিভার গোল্ডস্মিথ তার গল্পে এক আশ্চর্য চীনা আয়নার কথা উল্লেখ করেছেন। এ আয়নার সাহায্যে যে কোনো মানুষের মন ও সেই মুহূর্তে সে কী ভাবছে তা বলে দেওয়া যেত। আচ্ছা এমন একটা আয়না যদি পাওয়া যেত তা হলে কতই না ভালো হতো। মানুষের ভেতর আর বাহিরটা একই চিন্তা দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছে কিনা তা বোঝা যেত। মানুষ মানুষের কাছে প্রতিদিন ধরা পড়ে যেত। তখন লজ্জা-শরমের মাথা মানুষ খেতে পারত না। হয়তো একটা আয়না মানুষকে পরিবর্তন করে দিত। সারা পৃথিবীর মানুষদের পরিবর্তন ঘটিয়ে মানবিক পৃথিবীর উত্থান ঘটাত। তবে যা লিখছি তার সবটাই তো স্বপ্ন। স্বপ্ন কখনো কি সত্য হয়। এখন খারাপ মানুষদের স্বপ্ন সফল হয়, ভালো মানুষদের স্বপ্ন ভেঙে যায়। তবে স্বপ্ন সফল হলেই সার্থক হয় না বরং স্বপ্ন বিফল হলেই সার্থক হয়। খুব জটিল একটা অঙ্কের খেলার মতো। যেটা মানুষ স্বপ্ন ভাবে সেটা স্বপ্ন হয় না বরং যেটা মানুষ স্বপ্ন ভাবে না সেটাই স্বপ্ন হয়। একটা মানুষ স্বপ্ন দেখছে, সে একটার পর একটা কাগজের টাকা সাজিয়ে টাকার পাহাড় গড়ছে। তার পাহাড় যত বড় হচ্ছে, ভোগবিলাসিতাও তত বাড়ছে। তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ক্ষমতাও বাড়ছে। তার চারপাশে ক্ষমতালোভী মানুষদের সংখ্যাও বাড়ছে। সে লোকটা তখন তার স্বপ্ন সফল করার জন্য দুর্নীতিকে বেছে নিচ্ছে। অবৈধতাকে তার জীবনের অংশে পরিণত করছে। তার স্বপ্ন হয়তো সফল হচ্ছে কিন্তু সার্থক হচ্ছে না। কারণ তার চারপাশের মানুষ জানে লোকটা ভালো মানুষ নয়। লোকটা একটা চোর কিংবা দুর্নীতিবাজ। তবে এই সত্যটা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়ার মতো মানুষ তো আর নেই। সবার ভেতরে একটা ভয়। সে ভয়টা যৌক্তিক কিংবা অযৌক্তিক কিংবা দুটোই হতে পারে। ভয় মানুষ নিজে তৈরি করে। সে ভয় মানুষের মেরুদÐটা ভেঙে দেয়, মানুষকে ভেতরে ভেতরে খেয়ে ফেলে। একটা ভীতু সমাজ সমাজের ভেতরে ভেতরে এভাবেই গড়ে ওঠে। সেখানে মানুষের ভেতরে আগাছা-পরগাছা জন্মে। পরজীবী মানুষ জন্মে। ধীরে ধীরে সমাজে নেতিবাচক স্বপ্নগুলো জায়গা করে নেয়, ইতিবাচক স্বপ্নগুলো হারিয়ে যায়। তার পরও অদ্ভুত আঁধার নেমে আসা পৃথিবীতে স্বপ্ন মাথা তুলে দাঁড়াতে চায়, ইতিবাচকতার শক্তিতে মানুষকে আঁকড়ে ধরতে চায়। হয়তো সবকিছুতে পচন ধরেছে, মানুষকে স্বপ্ন দেখালে মানুষ সেটাকে অবাস্তব ভাবছে। ইথিক্যাল লেখাগুলোকে মানুষ প্রাচীনতার দায়ে দায়ী করছে। কিন্তু যা প্রাচীন তার সব মৃত নয় সে ধারণা দ্বারা মানুষ প্রভাবিত হতে পারছে না। কারণ মানুষ নেতিবাচকতাকে যতটা প্রাধান্য দিচ্ছে, ইতিবাচকতাকে ততটা অবহেলা করছে। পৃথিবীতে খারাপ অনেক কিছুই ঘটছে, ভালোও তো ঘটছে। সে ভালোটা মানুষ হয়তো দেখতে পাচ্ছে না কিংবা মানুষকে দেখানো হচ্ছে না। কারণ ভালো খবরের প্রতি মানুষের আগ্রহ কমছে, খারাপ খবরের প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়ছে। মানুষের এই নেতিবাচক মনস্তত্ত¡ সংবাদমাধ্যমগুলোকেও তাদের কৌশল পরিবর্তনে বাধ্য করছে। মানুষ বাণিজ্যিক একটা পৃথিবী বানিয়েছে। যেটা অনেকটা গ্যাসভর্তি বেলুনের মতো। যতক্ষণ সেই গ্যাসের শক্তি থাকে ততক্ষণ বেলুন তাকে শক্তিশালী ভাবে। বেলুনটা কখনো ভাবতে চায় না তার এই শক্তিটা তার নিজের না, বরং সে যার ওপর নির্ভর করে ফুলেফেঁপে উঠেছে শক্তিটা তার। চাঁদ ততক্ষণ সুন্দর যতক্ষণ সূর্যের আলো সে পায়। সূর্য যদি নিজেকে গুটিয়ে নেয় তখন চাঁদের সৌন্দর্য আঁধারে হারিয়ে যায়। মানুষের জীবনটাও এমনই। মানুষ যতক্ষণ নিজের পায়ের ওপর দাঁড়িয়ে থাকতে পারে ততক্ষণ মানুষের নিজের অস্তিত্ব থাকে। তবে নিজের পায়ের আরামের জন্য মানুষ যখন কাঠের কিংবা স্বর্ণের চেয়ারে বসে তখন মানুষের শক্তির নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি চেয়ারের কাছে চলে যায়। যদিও চেয়ারের জীবন নেই। নিজের কোনো শক্তি নেই। তবে এগুলো সবই মানুষের জন্য এক একটা নিদর্শন। মানুষ যদি সেখান থেকে শিক্ষা নিতে পারে তবেই মানুষ নিজের শক্তিতে দাঁড়াতে পারে। নতুবা শ্রীলংকা কিংবা লেবাননের মতো ভেঙে পড়তে খুব বেশি সময় লাগবে না। পৃথিবীতে অনেক শক্তিশালী সভ্যতার উত্থান ঘটেছিল, পতনও ঘটেছিল। পৃথিবীতে মানুষ মানুষকে গিনিপিগ বানানোর ফাঁদ বানিয়েছে, সে ফাঁদে পা ফেললেই পড়ে যাওয়ার সমূহ সম্ভাবনা। মানুষকে এই সত্যটা সব সময় অনুধাবন করতে হবে। বাণিজ্যিক পৃথিবী ততক্ষণ বেঁচে থাকে যতক্ষণ মানবিক পৃথিবী বেঁচে থাকে। ইট-পাথরের নিচে বাস করা মানুষ যতটা অসুখী, খোলা আকাশের নিচে বাস করা মানুষরা ততটাই সুখী। এই বিপরীতমুখী জায়গাগুলোতে মানুষকে এসে দাঁড়াতে হবে, ভাবতে হবে। যেগুলো মানুষকে নিজের শক্তি চেনাবে। মানুষকে থামিয়ে দিয়ে আবার নতুন করে চলার শক্তি জোগাবে। কারণ থেমে যাওয়া মানে হেরে যাওয়া নয়। থেমে যাওয়া মানে প্রস্থান নয় বরং নতুন করে আগমন।

 

অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী : শিক্ষাবিদ, কলাম লেখক ও

ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর

নিউজটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published.

এ জাতীয় আরো খবর..

© All rights reserved © 2019 WeeklyBangladeshNY.Net
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com