মঙ্গলবার, ০৯ অগাস্ট ২০২২, ০৪:৫৮ অপরাহ্ন

বাংলাদেশে নেপোলিয়নিক কোডের প্রস্তাবনা

অধ্যাপক কাজী মুহাম্মদ মাইন উদ্দীন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১ জুলাই, ২০২২
  • ২২ বার

আইন-হলো কতগুলো সুনির্দিষ্ট নিয়ম। রাষ্ট্রবিজ্ঞানে দুই অর্থে আইন বুঝিয়ে থাকে। প্রথমত, সংকীর্ণ অর্থে আইন হলো তা যা রাষ্ট্রীয় কার্যাবলী পরিচালনার জন্য প্রদত্ত হয়। দ্বিতীয়ত ব্যাপক অর্থে সুস্থ রাজনৈতিক জীবনের স্বার্থে যেসব বিধিবিধান ও নিয়মকানুন তা হলো রাষ্ট্রীয় আইন। আধুনিক রাজনৈতিক আইন প্রধানত দুই প্রকারের হয়। একটি হলো জাতীয় আইন, অন্যটি হলো আন্তর্জাতিক আইন। একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র তার ভৌগোলিক সীমারেখার মধ্যে জাতীয় আইন বলবত করে। আবার বিভিন্ন সার্বভৌম রাষ্ট্রের সম্পর্ক গড়ার ক্ষেত্রে তাদের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করার জন্য আন্তর্জাতিক আইন। আইনের অনেক উৎস রয়েছে। যেমন- প্রথা, ন্যায় বোধ, ধর্ম, বৈজ্ঞানিক আলোচনা, নির্বাহী ঘোষণা বা ডিক্রি, জনমত, সংবিধান প্রভৃতি।

সরকার পরিচালিত হয় অভ্যন্তরীণ আইনে, তা অভ্যন্তরীণ সুনির্দিষ্ট নিয়মের অধীন। সরকারের বিভিন্ন শ্রেণী বিভাগ রয়েছে। তবে তিন ধরনের আধুনিক সরকারের সন্ধান রাষ্ট্রবিজ্ঞানে পাওয়া যায়। এগুলো হলো উদার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা, সর্বাত্মক ব্যবস্থা ও স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থা। উদার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় স্বাধীন বিচার বিভাগ, ব্যক্তি স্বাধীনতা, রাজনৈতিক দলও দলসমূহের কার্যক্রম এবং নিয়মিত নির্বাচনের অস্তিত্ব থাকে। সর্বাত্মক ব্যবস্থায় ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনের সর্বস্তরে সরকারের কঠোর নিয়ন্ত্রণ থাকে। কারণ এরা আদর্শবাদী আবার কখনো এরা আদর্শহীন। এ ধরনের ব্যবস্থা কখনো সাম্যবাদী আবার কখনো ফ্যাসিবাদী হয়। স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড সীমিত থাকে। এখানে বল প্রয়োগ প্রবণতা বিরাজমান এবং একক সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এ ধরনের সরকার সামরিক সরকার হতে পারে আবার বেসামরিক সরকারও হতে পারে।

গাঠনিক দিক থেকে বাংলাদেশ হলো উদার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সরকার। কিন্তু সরকারের যাবতীয় কর্মকাণ্ডকে কেন্দ্র করে এখানে কোনো ধরনের সরকার অস্তিত্বশীল তা নিয়ে তর্ক সৃষ্টি হতে পারে। পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে সর্বাত্মক ব্যবস্থায় আদর্শবাদ রয়েছে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায় বাংলাদেশে সর্বাত্মকবাদী সরকার অস্তিত্বশীল। এখানে যে আদর্শবাদ তার নাম হলো মুজিববাদ। আবার এখানে ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে সরকারের ব্যাপক নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। যেমন এখানে সরকারের কর্মের সমালোচনা করলে বিপদের আশঙ্কা থাকে। বহু বিরোধী মতের বেসরকারি শিক্ষক, সরকারি কর্মচারী ও কর্মজীবীরা চাকরি হারিয়েছে এবং ওএসডিও হয়েছে। কিন্তু সরকারের পক্ষে অনর্গল কথা বলা যায়।

সুতরাং এখানে সর্বাত্মক ব্যবস্থা অস্তিত্বশীল। অন্য দিকে স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থায় যে বৈশিষ্ট থাকে তা আমাদের দেশে রয়েছে। এখানে বর্তমানে সীমিত রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড রয়েছে। যেমন বড় রাজনৈতিক দলের কর্মে সরকার বাধা দান করে এটাকে সীমিত করে রেখেছে। সরকারি দলের লোকদের জনগণের উপর বল প্রয়োগ লক্ষণীয় যা কৌশলে অথবা অন্য উপায়ে হয়ে থাকে।

কোভিড-১৯-এর কারণে যাতায়াত ব্যবস্থায় ৫০ শতাংশ আসনখালীর রাখার নির্দেশ দান করে যাত্রীদের কাছে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা হয়, অথচ ৫০ শতাংশ আসনখালী রাখা হয় না। উভয় ক্ষেত্রে অতিরিক্ত অর্থ আদায় হচ্ছে। এ ছাড়াও এখানে রয়েছে এক ব্যক্তি সিদ্ধান্ত। যেখানে যা কিছু হয় তা ওই এক স্থান থেকে নির্দেশনা আসে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে এখানে বেসামরিক স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থা বিরাজমান। এই অবস্থায় গাঠনিক দিক থেকে দিক বাংলাদেশে উদার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বিরাজমান আর প্রয়োগিক দিক থেকে এখানে সর্বাত্মক ব্যবস্থা এবং স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থার সংমিশ্রণ ঘটেছে।

এধরনের অবস্থায় বাংলাদেশের সরকার ব্যবস্থা হলো একটি ‘সংকর সরকারব্যবস্থা’। এটাকে আধুনিক সরকারব্যবস্থার আরেকটি রূপ আখ্যায়িত করা যেতে পারে। এ ধরনের ব্যবস্থায় সরকার পরিচালিত হয়ে আসছে এক যুগেরও বেশি সময় ধরে। ফলে স্থানীয় ও জাতীয় নির্বাচনগুলোর গ্রহণ যোগ্যতা হারিয়েছে। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আরোহরণের জন্য প্রতিটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নির্বাচনের ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু নির্বাচনকে গ্রহণ যোগ্য করার জন্য একটি পারফেক্ট নির্বাচনকালীন সরকারের আবশ্যিকতা থাকে।

প্রফেসর ড. এস এম হাসান তালুকদার তার “নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠান, নির্বাচন কমিশন গঠন এবং নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা : বাংলাদেশ প্রেক্ষপট” শিরোনামের একটি প্রবন্ধে নির্বাচনকালীন তিন ধরনের সরকারের কথা উল্লেখ করেছেন। এগুলো হলো- নির্দলীয় সরকার, ইনকামবেন্ট সরকার এবং সর্বদলীয় সরকার। ১৯৯৬ সালে ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে নির্দলীয় সরকার যুক্ত হয়। বর্তমান সরকার নামে মাত্র সর্বদলীয় সরকার যুক্ত করেছে। তবে নির্দলীয় সরকারের মাধ্যমে যে জাতীয় নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে যেগুলি বেশ গ্রহণ যোগ্যতা পেয়েছে।

ইনকামবেন্ট সরকার হলো নির্বাচনের প্রাক্কালে যে সরকার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকে। এ ক্ষেত্রে দলীয় সরকার যদি ইনকামবেন্ট সরকার হয় তাহলে নির্বাচনে নিরপেক্ষতা আশা করা যায় না। উত্তম নির্বাচনের জন্য কতগুলো দিক নির্ধারণ করতে হয়। যেমন সার্বজনীন ভোটাধিকার, প্রত্যক্ষ নির্বাচন, গোপন ভোটদান নিশ্চিতকরণ, নির্ভুল ভোটার তালিকা তৈরি, নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষ ভ‚মিকা, সুষ্ঠু নির্বাচনী পরিবেশ তৈরি প্রভৃতি। দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন হলে এসব দিকের ব্যঘাত ঘটে। অন্তত আমাদের দেশে এধরনের সরকারের অধীনে উত্তম নির্বাচনের আশা করা যায় না। তাই আমাদের দেশে নির্বাচনকালীন সরকার দল নিরপেক্ষ হওয়া বাঞ্ছনীয়। কিন্তু সংবিধানে তা নেই। তাহলে সংবিধান সংশোধন করতে হবে। বর্তমানে সরকার যদি সংবিধান সংশোধন না করে তা হলে কি করতে হবে?
প্রাসঙ্গিক আলোচনায় বলতে হচ্ছে নেপোলিয়ন ১৮০৪ সালের ২১ মার্চ দেশের চারজন প্রথিতযশা আইনজীবি নিয়ে যে আইন সংস্কার করেছিলেন তা হলো নেপোলিয়ন কোড। এই আইনে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনের ব্যাপক সংস্কার সাধিত হয়, যা সমগ্র ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে।

চারজন বিশিষ্ট আইনজীবী দীর্ঘ চার বছর অক্লান্ত পরিশ্রম করে কোড নেপোলিয়ন রচনা করেন। এই আইন দেওয়ানি, ফৌজদারি ও বাণিজ্যিক আইনে বিভক্ত ছিল। সম্রাট নেপোলিয়ন প্রাকৃতিক আইন ও রোমান আইনের সমন্বয় সাধন করে কোড নেপোলিয়ন রচনা করেছিলেন। সে সময় এর ইতিবাচক অনেক দিক ছিল। বাংলাদেশে বর্তমানে যে অবস্থা বিরাজ করছে তা থেকে উত্তরণের জন্য ব্যাপক রাষ্ট্রীয় সংস্কারের প্রয়োজন। তাই দেশের আইনের সংস্কার অপরিহার্য। এই প্রবন্ধে এই ধরনের সংস্কারের নাম দেয়া হলো ‘বাংলাদেশ কোড’।

বাংলাদেশে কোড মূলত দু’টি ধাপে বিভক্ত হবে; একটি হলো অভ্যন্তরীণ বিষয়ক অপরটি হবে বৈদেশিক বিষয়ক। অভ্যন্তরীণ দিকটি বহুমুখী অংশে বিভক্ত হবে। এখানে থাকবে নির্বাচন কালীন সরকার ব্যবস্থা (আলোচ্য প্রবন্ধে দল নিরপেক্ষ সরকারের পরামর্শ প্রদান করা হচ্ছে), নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন গঠন, অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তানীতি প্রণয়ন, স্বাস্থ্যনীতি, শিক্ষানীতি প্রণয়ন, অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যিনীতি প্রণয়ন, সার্বিক জনকল্যাণ সাধিত হয় এমন অর্থনীতি প্রণয়ন। এ ছাড়াও থাকবে শিল্পনীতি। দলীয় সরকার আসবে, দলীয় সরকার যাবে কিন্তু ‘বাংলাদেশ কোড’ অক্ষুণ্ণ থাকবে। বৈদেশিক বিষয়ক দিকে থাকবে সর্বভৌমত্ব রক্ষানীতি, বৈদেশিক বাণিজ্যনীতি, সমরাস্ত্রনীতি প্রভৃতি।

এই ক্ষেত্রে একটি প্রশ্ন তৈরি হয় তা হলো সংবিধানের কি হবে? আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে সংবিধান হলো আইনের উৎস। যেহেতু আইনের সংস্কারের ফলস্বরূপ ‘বাংলাদেশ কোড’ রচিত হবে সেহেতু সংবিধান থেকেও প্রয়োজনীয় অংশ নিতে হবে। ‘বাংলাদেশ কোড’ রচিত হবে সম্পূর্ণ নির্দলীয় দৃষ্টিকোণ থেকে গভীর দেশ প্রেমের চিন্তাধারা থেকে এবং একটি সমৃদ্ধশালী ও জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্রগঠনের লক্ষ্যে।

কারা বাংলাদেশ কোড রচনা করবে? এই প্রবন্ধে একজন চেয়ারম্যানসহ ২১ সদস্য বিশিষ্ট একটি কমিটির পরমর্শ প্রদান করা হলো। কমিটির নাম হবে ‘বাংলাদেশ কোড প্রণয়ন কমিটি’। চারজন সত্তোরোর্ধ্ব প্রখ্যাত আইনজীবী, দু’জন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, দুইজন অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা, ষাটোর্ধ্ব চারজন অবসরপ্রাপ্ত আমলা- যাদের মধ্যে দু’জন বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডার, দু’জন বিসিএস (পররাষ্ট্র) ক্যাডার, একজন অবসরপ্রাপ্ত নির্বাচন কমিশনার, একজন অবসরপ্রাপ্ত মহাহিসাব রক্ষক, দু’জন বিশিষ্ট ব্যবসায়ী (শিল্পপতি), দু’জন অবসরপ্রাপ্ত বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নর, দু’জন আন্তর্জাতিক খ্যাতিমান ইসলামী চিন্তাবিদ (সত্তোরোর্ধ্ব)।

এই ধরনের সংস্কার করার দায়িত্ব কাদের? এই প্রশ্ন এসে যায়। সাধারণত দেশ প্রেমিক প্রধান রাষ্ট্র পরিচালক এই ধরনের সংস্কারের প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারেন। কিন্তু সরকার থেকে সমস্যা সৃষ্টি হলে সর্বস্তরের পেশাজীবীরা পরস্পরের সাথে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে স্ব-উদ্যোগে এগিয়ে আসতে হবে এবং এ ক্ষেত্রে সফল হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। বাংলাদেশ কোড অপরিবর্তনীয় থাকবে। ‘বাংলাদেশ কোড’ এর আলোকে অন্যান্য প্রয়োজনীয় সংস্কার হবে। ‘বাংলাদেশ কোড’ প্রণয়নের জন্য সরকারকে পেশাজীবীদের সহায়তা নিতে হবে।

সরকারের দু’টি ধারা রয়েছে। একটি হলো স্থায়ী ধারা। এরা ব্যাপক প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে কর্মজীবনে প্রবেশ করে সরকারের ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে অবস্থান করে রাষ্ট্র পরিচালনায় অংশগ্রহণ করে। এটা হলো আমলাতান্ত্রিক ধারা। এখানে প্রচুর মেধার সমাহার রয়েছে। (স্থায়ী সরকারের দুটি রূপ আছে; একটি বেসামরিক রূপ ও অপরটি সামরিক রূপ)। অন্যটি হলো অস্থায়ী ধারা। এরা দলীয় সরকার; নির্বাচনের মাধ্যমে একটা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়।

এখানে মেধা ও মেধাহীন নেতৃত্বের সমাহার রয়েছে। আপনি যদি ছাত্র রাজনীতির দিকে দৃষ্টিপাত করেন তাহলে দেখবেন মেধাবী খুব কম, স্বল্পসংখ্যক মধ্যম মেধাবী এবং বখাটে ব্যাপক অংশ রাজনীতিতে থাকে। এরা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয় বলে রাষ্ট্রপরিচালনার জন্য স্থায়ী সরকারের উপর নির্ভর করে থাকে। পেশাজীবীরা প্রবন্ধে উল্লিখিত উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য স্থায়ী সরকারের বিশেষ করে এর দ্বিতীয় রূপটির সহায়তা নিবে। বাংলাদেশ কোড প্রণয়ন কমিটি গঠন করে একটা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ‘বাংলাদেশ কোড’ রচনা করবে। অতঃপর উত্তম নির্বাচনের ব্যবস্থার মাধ্যমে রাষ্ট্রকে দলীয় সরকার উপহার দিয়ে বিদায় নেবে।

লেখক : প্রবন্ধকার ও বিশ্লেষক।

নিউজটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published.

এ জাতীয় আরো খবর..

© All rights reserved © 2019 WeeklyBangladeshNY.Net
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com