শুক্রবার, ১২ অগাস্ট ২০২২, ১১:১৫ অপরাহ্ন

বাড়ছে ঘরে থেকে সাজাভোগ

বাংলাদেশ ডেস্ক :
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১ আগস্ট, ২০২২
  • ২৭ বার

মারামারির এক মামলায় গত ২৫ জুলাই ৫ আসামিকে প্রবেশনে পরিবারের সঙ্গে থেকে সাজা ভোগের সুযোগ দেয় রাজশাহীর একটি আদালত। রাজশাহীর সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ৩-এর বিচারক লিটন হোসেন তাদের ৬ মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দিয়ে এ সুযোগ দেন। প্রথমবারের মতো অপরাধ করায় এবং সাজার পরিমাণ কম হওয়ায় আসামিরা ৬টি সহজ শর্তে প্রবেশনে ঘরে থেকে সাজা ভোগের এ সুযোগ পান। তাদের কারাগারে না পাঠিয়ে রাজশাহীর সমাজসেবা অধিদপ্তরের প্রবেশন কর্মকর্তা মতিনুর রহমানের তত্ত্বাবধানে দেওয়া হয়। পাঁচ আসামি হলেন- চাঁপাইনবাবগঞ্জের রফিকুল ইসলাম ও শফিকুল ইসলাম এবং রাজশাহীর তানোর থানার কালাম উদ্দিন, মজিবুর ও আতাউর।

শর্তের মধ্যে রয়েছে- শান্তিপূর্ণভাবে জীবনযাপন করতে হবে, ৬টি করে ফলজ বৃক্ষ রোপণ করতে হবে, আদালতের অনুমতি ছাড়া দেশের বাইরে যাওয়া যাবে না, কোনো মাদক বহন কিংবা সেবন করতে পারবেন না, ৫ ওয়াক্ত নামাজ পড়তে হবে এবং এক বছরের মধ্যে কোরআন শিখতে হবে।

১৯৬০ সালের ‘দ্য প্রবেশন অব অফেন্ডার্স অর্ডিনেন্স’র অধীনে ছোটখাটো অপরাধে দণ্ডিতরা এমন সুযোগ পাচ্ছেন। আইনানুগভাবেই লঘু অপরাধীদের প্রবেশন ব্যবস্থার মাধ্যমে কারাগারে না পাঠিয়ে পারিবারিক পরিবেশে একজন প্রবেশন কর্মকর্তার তত্ত্বাবধানে পরিশুদ্ধ করার সুযোগ করে দেওয়া হচ্ছে।

৬২ বছরের পুরনো ওই অধ্যাদেশে প্রবেশনে পাঠানোর সুযোগ থাকলেও চার বছর আগে এর তেমন প্রয়োগ ছিল না। ২০১৯ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি ওই অধ্যাদেশ কার্যকরভাবে প্রয়োগ করতে একটি অধ্যাদেশ জারি করে সুপ্রিমকোর্ট প্রশাসন। এর পর থেকে আসামিদের প্রবেশনে পাঠানোর হার বহুগুণে বেড়েছে। সমাজসেবা অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে প্রবেশনে পাঠানো হয় মাত্র ১৭১ আসামিকে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বেড়ে হয় ২৫৭ জন। আর অধ্যাদেশ জারির পর ২০১৯-২০ অর্থবছরে প্রবেশনে পাঠানো হয় ১ হাজার ১১৪ জনকে। এর পর ২০২০-২১ অর্থবছরে ১ হাজার ৫৪৭ জন এবং ২০২১-২০২২ অর্থবছরে ৩ হাজার ৩৬৫ জনকে প্রবেশনে পাঠিয়েছেন আদালত। গত জুনে সারাদেশে প্রবেশন কর্মকর্তাদের তত্ত্বাবধানে ছিলেন ৪ হাজার ৬৭৫ জন আসামি।

১৯৬০ সালের ওই অধ্যাদেশ অনুযায়ী, একজন আসামিকে জেলে না পাঠিয়ে সমাজসেবা অধিদপ্তরের একজন প্রবেশন কর্মকর্তার তত্ত্বাবধানে প্রবেশনে পাঠানো হয়। দণ্ডিত আসামির বয়স, স্বভাব-চরিত্র, অতীত কর্মকাণ্ড, শারীরিক ও মানসিক অবস্থা, অপরাধের ধরন ও সাজা বিবেচনা করে প্রবেশনে পাঠানোর সিদ্ধান্ত দেওয়ার এখতিয়ার আদালতের। প্রবেশনে পাঠানো আসামিকে বেশ কিছু শর্তের জালে রাখা হয়। আসামিকে আদালতে হাজির হওয়ার নির্দেশ দিলে তাকে হাজির হতেই হবে। শর্ত ভঙ্গ করলে তাকে পাঠানো হয় কারাগারে।

এর আগে গত ২০ জুলাই বিভিন্ন অভিযোগে ৬৫ শিশুকে প্রবেশনে বাবা-মায়ের কাছে থাকার অনুমতি দেন সুনামগঞ্জের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল ও শিশু আদালত। ছোটখাটো ‘অভিযোগে’ এসব শিশুদের প্রায়ই আদালতে হাজিরা দিতে হয়। সে কারণে শিশুদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিয়তা এবং শিক্ষাজীবন ব্যাহত হচ্ছে। এসব অসুবিধা থেকে মুক্তি দিতে কারাগারে না পাঠিয়ে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে রেখে সংশোধনের জন্য সুযোগ করে দেন আদালত। এ সময় তাদের হাতে জাতীয় পতাকা, ফুল, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক বই, কলম-ডায়েরি উপহার দেওয়া হয়। প্রবেশনে থাকাকালে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জানা এবং মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক বই পাঠ করা, কম্পিউটার প্রশিক্ষণ, ইলেকট্রিক্যাল কাজ, গবাদিপশু পালনসহ বিভিন্ন কারিগরি প্রশিক্ষণ গ্রহণ করা, প্রতিদিন অন্তত দুটি ভালো কাজ করা ও ডায়েরিতে লিখে রাখা, প্রত্যেকে কমপক্ষে ২০টি করে গাছ লাগানো এবং গাছের পরিচর্যা করা, নিয়মিত ধর্মকর্ম করা, বাবা-মায়ের আদেশ-নির্দেশ মেনে চলা, মাদক থেকে দূরে থাকা ও অপরাধমূলক কাজে নিজেকে না জড়ানোর শর্ত দেন আদালত। এসব শর্ত প্রতিপালিত হচ্ছে কিনা, তা প্রবেশন কর্মকর্তাকে পর্যবেক্ষণের নির্দেশনা দেন আদালত।

সুনামগঞ্জের প্রবেশন কর্মকর্তা শফিউর রহমান আমাদের সময়কে বলেন, ‘বর্তমানে তার অধীনে ২০০ জনের বেশি প্রবেশনে রয়েছেন। গত এক বছরে অন্তত ৮ জন প্রবেশনের শর্ত ভেঙেছেন। আমি আদালতকে বিষয়টি জানিয়েছি। আদালত পরবর্তী ব্যবস্থা নিয়েছেন। কারও কারও প্রবেশন বাতিল করে কারাগারে পাঠিয়েছেন, আবার কাউকে সতর্ক করেছেন।’

মাগুরার প্রবেশন কর্মকর্তা মেহেতাজ আরা আমাদের সময়কে বলেন, বর্তমানে আমার তত্ত্বাবধানে ৩১ জন আসামি প্রবেশনে আছেন। দু-এক বছরের মধ্যে কোনো আসামিই প্রবেশনের শর্ত ভাঙেননি।

কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দিন দিন প্রবেশনের সুবিধাভোগীর সংখ্যা বাড়লেও তাদের তত্ত্বাবধানে পর্যাপ্ত লোকবল নেই।

প্রবেশনের সুযোগ পাবেন যারা

কোনো পুরুষ ১৮৬০ সালের দণ্ড বিধির ষষ্ঠ (রাষ্ট্রবিরোধী) ও সপ্তম অধ্যায়ের (সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনী সংক্রান্ত) অপরাধ বা দণ্ডবিধির ২১৬(ক), ৩২৮, ৩৮৬, ৩৮৭, ৩৮৮, ৩৮৯, ৩৯২, ৩৯৩, ৩৯৭, ৩৯৮, ৩৯৯, ৪০১, ৪৫৫, ৪৫৮ ধারার অপরাধ অথবা মৃত্যুদণ্ড কিংবা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডনীয় অপরাধ ব্যতীত অন্য কোনো দণ্ডনীয় অপরাধে দণ্ডিত হলে এ আইনে সুবিধা পাবেন। কোনো নারী মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হওয়ার মতো অপরাধ ব্যতীত অন্য কোনো দণ্ডনীয় অপরাধে দণ্ডিত হলে অপরাধের প্রকৃতি, পারিপার্শ্বিকতা, অপরাধীর চরিত্র ইত্যাদি বিবেচনা করে আদালত শাস্তি প্রদানের পরিবর্তে প্রবেশনে পাঠাতে পারেন। আর শিশু আইনের অধীনে প্রতিটি শিশুই প্রবেশনের সুবিধা পাবেন।

জানতে চাওয়া হলে আইন বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক বলেন, আইনে বেশি দণ্ডপ্রাপ্তদের প্রবেশনে পাঠানোর সুযোগ থাকলেও বর্তমানে ছোটখাটো অপরাধে দণ্ডিত, অথবা প্রথমবার সাজা পেয়েছে, যাদের অতীত রেকর্ড ভালোÑ এমন সব আসামিকে প্রবেশনে পাঠানো হচ্ছে। এটা একটা উত্তম ব্যবস্থা। তিনি বলেন, ৬০ বছর আগে আইন হলেও দুর্ভাগ্যজনকভাবে এটার প্রয়োগ হচ্ছিল না। কিন্তু বিদেশে প্রবেশনের সংখ্যা অনেক বেশি, যাতে সহজে আসামিরা সংশোধিত হওয়ার সুযোগ পায়। কারণ একজন আসামিকে কারাগারে রাখা হলে সে ভয়ঙ্কর আসামিদের সঙ্গে মিশে আরও ভয়ঙ্কর অপরাধী হয়ে বের হতে পারে। এ জন্যই প্রবেশনে পাঠানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। এ দেশে প্রবেশনের সংখ্যা বাড়তে থাকলে সমাজে অপরাধের সংখ্যা কমার সম্ভাবনা রয়েছে।

নিউজটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published.

এ জাতীয় আরো খবর..

© All rights reserved © 2019 WeeklyBangladeshNY.Net
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com